পুরাণ সারসংক্ষেপঃ ভূমিকা পর্ব (শেষ অংশ)

............... তো সুয্যি মামার বিয়ের কথা যখন উঠলই, চাঁদ মামার বিয়েটাই বা বাকি থাকে কেন ? বিশেষ করে সে বিয়ের সাথে যেখানে জড়িয়ে আছে চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা আর কবিতার উপমা ! সে অতি প্রাচীন কালের কথা। ব্রহ্মার মানসপুত্র প্রজাপতি দক্ষ তাঁর বিবাহ যোগ্যা সুন্দরী ২৭ জন নক্ষত্র কন্যার জন্য পাত্র খুঁজছেন। চন্দ্র ছাড়া রূপবান আর তেমন কাউকে পেলেন না। তাই ২৭ কন্যাকেই চন্দ্রের হাতে তুলে দিলেন। শ্বশুর মশাই শুধু এটুকু আশা করলেন যে, স্বামী হিসেবে চন্দ্র ২৭ স্ত্রীকেই সমান ভালবাসবে। কিন্তু স্ত্রীদের মধ্যে রোহিনীর রূপে আর কামকলায় চন্দ্র এত মুগ্ধ হয়ে গেলেন যে, তার ঘরে একবার ঢুকলে আর অন্য স্ত্রীদের কথা মনেই আসে না ; এমনকি রোহিনীর ঘর থেকে বেরও হন না। তখন ভালবাসা বঞ্চিত বাকি ২৬ বোন তাদের পিতাকে দুঃখের কথা জানালে শ্বশুর দক্ষ জামাতাকে সাবধান করে দিলেন। কিন্তু ফলাফল ঐ একই। তখন ক্ষেপে গিয়ে শ্বশুর অভিশাপ দিয়ে বসলেন চন্দ্রকে,” দেবতা হয়েও তুই ন্যায়নীতিহীন ! যা তুই সন্তানহীন হ, তোর ক্ষয়রোগ হোক, তোর যক্ষ্মা হোক।“ যার তার নয়, চন্দ্রের যক্ষ্মা বলে কথা ! তখন থেকেই যক্ষ্মা রোগকে বলা হয় রাজরোগ। আর ২৭ জন স্ত্রী নিয়েও নিঃসন্তান বলেই চাঁদের কোন উপগ্রহ (সন্তান) নাই এবং এ কারণেই তার নিজস্ব গৌরবের আলো নাই ; ভ্রাতা সূর্যের আলোতে সে আলোকিত। এই হল চাঁদের উপগ্রহ আর নিজস্ব আলো না থাকার কারণ।
ওদিকে অভিশাপের কারণে চন্দ্রের যক্ষ্মা দেখা দিল, ক্ষয় শুরু হল। ২৭ কন্যাই এবার স্বামীর এ অবস্থা দেখে রাগ ভুলে পিতার পায়ে গিয়ে পড়ল,” বাবা, ফিরিয়ে নাও তোমার শাপ”। তখন পিতা দক্ষ বললেন,” একবার শাপ দিলে তা ফেরানো যায় না। ঠিক আছে, এখন থেকে চন্দ্রের ১৫ দিন ক্ষয় হবে, আর পরের ১৫ দিনে সে ক্ষয় পূরণ হবে।“ ব্যস ! এভাবেই তৈরি হল কৃষ্ণপক্ষ ও শুক্লপক্ষ। আর চন্দ্রের গায়ে যক্ষ্মার ক্ষয়ের দাগ ‘চাঁদের কলংক’ হিসেবে কবিদের মুখে চিরস্থায়ী হয়ে গেল।
বেদ বা উপনিষদের অলৌকিক দেবকূলকে সাধারণের স্পর্শে নিয়ে আসতে গিয়ে পুরাণকাররা আর কিছু করুন আর না করুন, দেবতাদের কখনো কখনো করুণ হাল করে ছেড়েছেন ! জরা-ব্যাধি-মৃত্যুকে ঠেকাবার বর দেয়ার অধিকারী ছিলেন যে দেবতারা, তারাই ভুগতে শুরু করলেন বিভিন্ন রোগেশোকে ! বলা বাহুল্য, তাদের দ্বারা বেশকিছু রোগের সূচনাও হয়। যেমন- ক্ষুধামান্দ্য বা অরুচি রোগ। যে দেবতার যজ্ঞই হোক না কেন, ঘি খেতে হয় অগ্নিকেই। ক্রমাগত ঘি খেতে খেতে বেচারার ক্ষুধা মরে গেল। দেববৈদ্য অশ্বিনীকুমারভাইয়েরা পরীক্ষা শেষে মত দিলেন অগ্নিদেবের ক্ষুধামান্দ্য রোগ হয়েছে ; রোগের উপশমের জন্য প্রচুর ভাজাপোড়া মাংস খাওয়া প্রয়োজন। রুচি ফেরানোর জন্যই খাণ্ডব বন পুড়িয়ে সব প্রাণির পোড়া মাংস খাওয়ানো হয় অগ্নিকে। তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।
আবার সৃষ্টির প্রথম যৌনরোগের স্রষ্টাও দেবতারাই। প্রজা সৃষ্টির পর সেই প্রজাদের বিশিষ্ট ও নিখুঁত প্রত্যঙ্গ নিয়ে ব্রহ্মা এক কন্যা সৃষ্টি করেন। অদ্বিতীয়া সুন্দরী ও সত্যপরায়ণা বলে ব্রহ্মা তাঁর নাম রাখেন অহল্যা। ব্রহ্মা অহল্যার সাথে ঋষি গৌতমের বিয়ে দেন। এই গৌতমের কাছে শাস্ত্র শিখতে আসেন দেবরাজ ইন্দ্র, লাম্পট্য-বিদ্যায় যিনি কিনা বহু আগের পণ্ডিত। একদিন সুযোগ বুঝে গৌতমের অনুপস্থিতিতে গুরুপত্নীকে ধর্ষণ করে এক বিরল গুরুদক্ষিণা দান করে বসলেন ইন্দ্র। বাড়ি ফিরে জানতে পেরে গৌতম ইন্দ্রকে অভিশাপ দেন এবং এর ফলে ইন্দ্রের সারা দেহে শতশত যোনির সৃষ্টি হয়। ইন্দ্র পড়লেন বেকায়দায়, না কারো সামনে আসতে পারেন, না শতযোনির চিহ্ন ঢাকতে পারেন। আধুনিককালের কোন যৌনরোগের সাথে এর সাদৃশ্য না থাকলেও, এমনকি শতযোনি ব্যাপারটা রূপক হলেও, নিঃসন্দেহে পুরাণমতে ইন্দ্রদেবই যৌনরোগের ধারক, বাহক ও প্রথম রোগি।
মজার ব্যাপার হল, পুরাণে অতি ছোটখাট বা তুচ্ছ খুঁটিনাটি বিষয়ও উঠে এসেছে যা পাঠক মনের জন্য আনন্দের খোরাক। যে রাগরাগিণীযুক্ত উচ্চাঙ্গসঙ্গীতকলা হিন্দুপুরাণে এবং ধর্মে রীতিমত সাধনা করে সরস্বতী দেবীর কাছ থেকে লাভ করতে হয়, সে বিদ্যার প্রথম বেসুরো গায়কিও পুরাণে দেখানো আছে। পুরাণ মতে ব্রহ্মার মানসপুত্র নারদ সর্বদাই নানা রাগ-রাগিণী যুক্ত সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। তিনি হাতে একটা বীণা নিয়ে সবসময় বাজাতে বাজাতে গান করতেন। কিন্তু সবসময় তাঁর সঙ্গীতে কিছু না কিছু ত্রুটি-বেসুর থেকেই যেত। ব্রহ্মার মানসপুত্র বলে কেউ কিছু বলারও সাহস পায় না। এদিকে নারদ এই ত্রুটি নিজে ধরতে পারতেন না, বরং নিজের গান নিয়ে খুব গর্ব করতেন, ভাবতেন তাঁর গান শুনে সবাই ধন্য ধন্য করছে। কিন্তু কাঁহাতক আর সহ্য করা যায় ! ক্রমাগত বেতাল-বাদন আর বেসুরো-গায়নে অতিষ্ঠ রাগ-রাগিণীরা শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিল নারদের এই গর্বকে খর্ব করার জন্য তারা স্বশরীরে আবির্ভূত হবে। তবে সে শরীর হবে ঠিক সেরকম - যেরকমভাবে নারদ বাজাচ্ছেন বা গাইছেন। হঠাৎ একদিন নারদ দেখতে পেলেন তাঁর যাত্রা পথে সব বিকলাঙ্গ, বিকৃত, বিদঘুটে নর-নারীরা একেবারে মিছিল করে উপস্থিত ! তিনি যেদিকে যান, তারাও সেদিকেই যায়। বিস্মিত নারদ তাদেরকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন তারা সবাই নারদের বিকৃত সঙ্গীতের প্রকৃত রূপ! লজ্জা পেয়ে নারদ এরপর সঠিকভাবে সঙ্গীতকলা শিক্ষার সাধনা শুরু করেন। (বর্তমানকালের “যাচ্ছেতাই সঙ্গীত একাডেমি”র ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম শিল্পী’দের এ পুরাণটি অবশ্যই পড়া উচিৎ।)
আবার প্রেমের ব্যাপারে যদি আসি, মিলন বা বিরহ – উভয় শাখাতেই প্রচন্ড রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন অজস্র পৌরাণিক কাহিনি আছে প্রায় প্রতিটা পুরাণেই। দেবদেবী, যক্ষ, অসুর, মানব, গন্ধর্ব, ঋষি, দেবলোকের বেশ্যা-নর্তকী সবার সব ধরণের সম-অসম প্রেমের কাহিনি আছে এখানে। আর এগুলোর সাথে মিশে আছে অসংখ্য পার্থিব বস্তুর ব্যাখ্যা। যেমন ধরি, আমাদের অনেকেরই প্রিয় শিউলি ফুলের কথা। শিউলির গন্ধে আমরা বিমোহিত। কিন্তু কেন এর ফল হয় না ? কেনই বা এ ফুল সূর্যের স্পর্শমাত্র ঝরে পড়ে ? যেখানে পুজার সকল ফুল গাছ বা বোঁটা থেকে সংগ্রহ করা হয়, সেখানে শিউলি কেন মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়েও ব্যবহার করা যায় ? এসব কেন’র উত্তর আছে পুরাণে। শিউলির আরেক নাম পারিজাত। স্বর্গের ফুল এটি। এ ফুল মর্ত্যে পাওয়া যায় না। কিন্তু কৃষ্ণের স্ত্রী সত্যভামা আর রুক্সিণী - দুজনেরই ইচ্ছে তাদের বাগানে এ ফুল থাকুক। এমনিতেই কৃষ্ণ কখনো কোন নারীকে বিমুখ করেছে বলে জানা যায় না, আর এ দু’জনতো রীতিমত তার স্ত্রী। কিন্তু সমস্যা হল যে, স্বর্গের সংবিধানও তো ভগবান কৃষ্ণেরই রচনা যাতে পারিজাত শুধু স্বর্গের শোভা, আবার নিজের স্বার্থে তো আর সেটার যখন তখন সে স্বর্গীয় সংবিধানে সংশোধনীও আনা যায় না। তাই কৃষ্ণ, যার মানবীয় কাম-প্রেম সব কাজই লীলা বলে আখ্যায়িত, স্ত্রীর মন রক্ষার্থে স্বর্গের বাগান থেকে পারিজাতের একটি ডাল চুরিই করে বসলেন। প্রিয়তমা স্ত্রীর বাগানে রোপিত সে ডালের ফুল থেকে যখন ঘ্রাণ ছড়ালো, তখন দেবরাজ ইন্দ্র রাগে ফেটে পড়লেন। কিন্তু রাগলে কী হবে ? বিষ্ণু-অবতার কৃষ্ণকে শাস্তি দেয়া ইন্দ্রের সাংবিধানিক ক্ষমতার বাইরে। তাই তিনি অভিশাপ দিলেন বেচারি পারিজাত ফুলকে। আর তার সে অভিশাপের কারণেই মর্ত্যের পারিজাত ফুল কখনোই ফল দিবে না, অর্থাৎ তার বীজে কখনোই নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে না।
আবার আরেক পুরাণের গল্পে আছে – পারিজাতিকা নামে এক রাজকন্যা সূর্যদেবের প্রেমে পড়ে। তাকে পাবার ব্যর্থতায় সে আত্মহত্যা করে। তার দেহের ছাই পবিত্র ভালবাসার কারণে পারিজাতবৃক্ষ রূপে ফুটে ওঠে। আর সূর্যদেবের বরে সে বৃক্ষের ফুল হয়ে ওঠে অশ্রুবিন্দুর মত যেটা ঝরে পড়বে সূর্যের আলোর স্পর্শে। এবং একারণেই শিউলি ফুল পবিত্রতার প্রতীক যা মাটি থেকে কুড়িয়ে নিলেও পূজা হয়।
শুধু এটুকুই নয় ; সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ সহ সবকয়টা গ্রহ-নক্ষত্রমন্ডলীর উৎপত্তি, অবস্থান ও এর কারণ নিয়ে কাহিনি আছে। এভাবে প্রেম-কাম, যুদ্ধ-সন্ধি, জয়-পরাজয় সবকিছু নিয়ে জড়িয়ে আছে পুরাণের শাখাপ্রশাখা। আর প্রতিটা কাহিনিতেই লৌকিক বা অলৌকিক দেবদেবিরা মানবায়িত হয়ে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, কোথায় যে ধর্মের শেষ আর পুরাণের শুরু, কিংবা উল্টোটা - বলা মুশকিল। এমনকি আমাদের মুখের ভাষাতেও আমাদের অজান্তেই প্রবাদপ্রবচন, বাগধারা হিসেবে মিশে গেছে অসংখ্য পুরাণের শব্দ-বাক্য। যেমনঃ বাতির নিচে অন্ধকার(ওঝার ব্যাটা বনগরু), মান্ধাতার আমল, জড়ভরত, অগস্ত্য যাত্রা, ধুন্দুমার কাণ্ড, রক্তবীজের ঝাড়, কালনেমির লঙ্কাভাগ (গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল), কুম্ভকর্ণের নিদ্রা, রাবণের গুষ্টি, রামরাবণের যুদ্ধ, ঘরের শত্রু বিভীষণ, লক্ষ্ণণ ভাই, রাবণের চিতা, লঙ্কাকাণ্ড, কুবেরের ধন, অগ্নিপরীক্ষা, পাণ্ডববর্জিত দেশ, বিদুরের খুদ, গজকচ্ছপের লড়াই, বালখিল্যতা, ধ্রুব সত্য, সাক্ষি গোপাল, ......... আরো কত ! প্রতিটা প্রবাদের পেছনেই আছে মজার সব গল্প-কাহিনি।
শোনাই যাক না কয়েকটা ! আসুন শুরু করি ........................
(ভূমিকা পর্ব সমাপ্ত)