স্মল পক্সের যুদ্ধে মানব জাতির বিজয়ের ইতিহাস


জীবনে বসন্ত এসেছে... 
দরাজ গলায় চাইলেই এখন যে কেউ গেয়ে উঠতে পারে। কিন্তু বসন্ত বা Pox আরো নির্দিষ্ট করে বললে গুটি বসন্ত বা Small pox ছিলো একসময় সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। এই রোগে আক্রান্ত ৩০% লোক মারা যেতো একসময়। যারা বেঁচে যেতো তারা যে সত্যিকার অর্থে বেঁচে যেতো, তা কিন্তু না- আজীবন শরীরে বয়ে বেড়াতে হতো বসন্তের চিহ্ন- অনেকেই হয়ে যেতো অন্ধ।
এই ভয়ানক রোগের আক্রমণে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে মানুষ একসময় যুদ্ধ ঘোষণা করে এর বিরুদ্ধে। আর শেষমেশ জয়ীও হয়। যে কারণে আজ এই ভয়াল রোগটা বিলুপ্ত। কিভাবে জয়ী হলো মানুষ? সেটাই জানবো আজ আমরা।
তবে তার আগে Pox সম্পর্কে একটু জানা যাক।  Variola এবং Varicella নামক দুটি ভাইরাসের আক্রমণে বসন্ত রোগ হয়। এর মধ্যে Variola-র আক্রমণে হয় গুটি বসন্ত। আর Varicella-র আক্রমণে হয় জলবসন্ত। Variola-র আবার আছে দুটো সাবটাইপঃ Variola major আর Variola minor. ভয়ংকর ছোঁয়াচে এই ভাইরাস আক্রমণ করে মানুষের ত্বকে। প্রথমে জ্বর দিয়ে শুরু হয়, তারপর গারা গায়ে গোটা ওঠে। রোগ সেরে গেলেও গোটার জায়গা গুলোতে থেকে যায় দাগ। গুটি বসন্ত এতো ভয়ানক হলেও জলবসন্ত মোটামুটি নিরীহ রোগ।

হিস্ট্রি টেকিং

ইতিহাসে প্রথম এই রোগের বর্ণনা দেন বিশপ মেরিয়াস, ৫৭০ সালে। তিনিই এর নাম ভ্যারিওলা উল্লেখ করেছিলেন। পারস্যের ডাক্তার আল রাজি এর সাথে হাম এর পার্থক্য নির্ণয় করেন। তবে এটা যে ছোয়াচে রোগ তা বের করেন ডা. গিলবার্ট, ১২০০ সালে। আর উইলিয়াম হেবারডেন ১৭৬৭ সালে গুটি আর জলবসন্তের মাঝে পার্থক্য করেন।
সতেরো শতকে ইউরোপের বেশ কয়েকবার এর মহামারির খবর পাওয়া যায়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত সারা দুনিয়া জুড়েই এটা অন্যতম প্রাণ সংহারক রোগ হিসেবে বিস্তৃত ছিলো। দশ-বিশ বছর পর পর একেক জায়গায় দেখা দিতো আর সেই এলাকার সমস্ত মানুষ মেরে সাফ করে দিতো

প্রতিরোধের শুরু

আঠারো শতকের একদম শেষদিকে এসে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলো। ১৭৯৬ সালে এডওয়ার্ড জেনার গুটিবসন্তের টিকা আবিস্কার করেন, আর ১৭৯৮ সালে স্পেনের রাজা চতুর্থ কার্লোস এর মেয়ে মারিয়া লুইজা গুটিবসন্তে আক্রান্ত হন। 

Smallpox Medicine
ইংল্যান্ডের ডাক্তার এডওয়ার্ড জেনার ঘটনাক্রমে খেয়াল করলেন যে কাউপক্সে আক্রান্ত লোকজন স্মলপক্সে আক্রান্ত হচ্ছে না। কাউপক্স মূলত গরুর রোগ হলেও সেটা মানুষেরও হয়, কিন্তু এটা স্মলপক্সের মতো প্রাণ সংহারি না। কয়েকদিন পরেই সেরে যায়। 
এই পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি একটা পদ্ধতি বের করলেন যার নাম তিনি দেন আর্ম-টু-আর্ম ট্রান্সফার। প্রথমে কাউপক্সের ক্ষত থেকে পূজ বা তরল নিয়ে সুস্থ্য লোকের চামড়ায় ক্ষত করে সেখানে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। সুস্থ্য লোকটা কাউপক্সে আক্রান্ত হতো, কয়েকদিন পর সেরেও উঠতো। কিন্তু তখন সে একই সাথে কাউপক্স আর স্মলপক্স দুটোর বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন হয়ে যেতো।
এটিই পৃথিবীর প্রথম ভ্যাক্সিনেশন এর ঘটনা।

এদিকে রাজকুমারী লুইজা আক্রান্ত হওয়ায় রাজপ্রাসাদের আতংক ছড়িয়ে পড়লো। কারণ ছোয়াচে রোগটার কারণে রাজার ঝাড় বংশ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারতো।
অনেক সাধনায় লুইজা আর রাজপরিবারের বাকি সবাইকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করেন রাজা কার্লোস। 
তবে তিনি শুধু সেখানেই থেমে গেলেন না। সরকারি অর্থ ব্যয়ে তিনি পুরো স্পেনে এই ভ্যাক্সিনেশন কার্যক্রম ছড়িয়ে দেন। রাজ চিকিৎসক ফ্রান্সিসকো ব্যালমিসকে আদেশ দেন স্পেনের নিয়ন্ত্রণাধীন সকল রাজ্যে যেনো এই টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। 
তখন স্পেনের রাজ্য সীমা উত্তর আর দক্ষিণ আমেরিকা জুড়েই বিস্তৃত ছিলো। ফলে তখন ব্যালামিসকে এই ভাইরাস জাহাজে করে আটলান্টিক মহাসাগর পার করে শহর থেকে শহরে পাঠাতে হয়। এতো দূর পর্যন্ত ভাইরাসকে জ্যান্ত রাখা ছিলো খুবই দুরূহ। ডা. ব্যালমিস প্রথপমে কাঁচের জারে করে পাঠান, কিন্তু তাতে নষ্ট হয়ে যায় সব।
ব্যর্থ হয়ে তিনি ডা. জেনারের পদ্ধতিই একটু উন্নত করে ব্যবহার করা শুরু করেন। অর্থাৎ ভাইরাস পরিবহনের জন্যে তিনি মানুষকেই ব্যবহার করেন। 
এর জন্যে বাইশ জন এতিম শিশুকে বেছে নেওয়া হয়। সবার বয়স ছিলো তিন থেকে নয়। সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় পর্যায়ক্রমে দলটির একেক সদস্যকে কাউপক্সে আক্রান্ত করে করে আর্ম-টু-আর্ম ট্রান্সফারের মাধ্যমে জ্যান্ত ভাইরাসকে স্পেনীয় উপনিবেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেই বাইশজন সুস্থ্য হলে মেক্সিকোতে পুনর্বাসন করা হয়।
এভাবে ইউরোপ ও আমেরিকা রক্ষা পেলেও তখনও আফ্রিকা ও ভারতবর্ষের দরিদ্র এলাকায় এর প্রকোপ চলতেই থাকে।
শেষে ১৯৬৭ সালে একদল ডাক্তার এই রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
বিভিন্ন দেশে সরকারি ভাবে শুরু হয় ভ্যাক্সিনেশন। আস্তে আস্তে নির্মূল হতে শুরু করে স্মল পক্স। ১৯৭৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটাকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে।

বাংলাদেশে স্মল পক্স

ভারতীয় উপমহাদেশে পক্সের আগমন মিশরীয় ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। ১৯০৭ পর্যন্ত প্রায় ৪৭ লক্ষ মানুষ মারা পড়ে এর আক্রমণে। 
বাংলাদেশে শুরুতে এর বিরুদ্ধে ভেষজ চিকিৎসা করা হতো। ১৮৭৪/৭৫ সালের এক ম্যাজিস্ট্রেটের বার্ষিক রিপোর্টে উল্লেখ পাওয়া যায় যে গুটিবসন্তের চিকিতসায় ৩ টি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ঃ ১. গলা ও ঘাড়ে আকন্দ গাছের রস ও সরিষা মালিশ করা, পথ্য হিসেবে পিঁয়াজ, কলা আর ভিজানো চাল খাওয়া, গরম পানিস সেঁক ও গোসল করানো। ২. কুমিরের মাংস, মধু ও রাতে তুলে আনা মাটির মিশানো মিশ্রণের মলম। ৩. বিষকাটালির রস আর বড় পদ্মফুলের রস মিশিয়ে গলা নাক ও কানে ঢেলে দেওয়া।
কিন্তু ১৯৫৭-৫৯ সালে যে মহামারি হয় তাতে প্রায় সোয়া লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয় এবং ৮৬ হাজার মানুষ মারা যায়।

গুটি বসন্তের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের যুদ্ধ
ফলশ্রুতিতে ১৯৬১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গুটিবসন্ত নির্মূল কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬৩ সালের মাঝেই প্রায় ৭ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষকে টিকা দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে কমতে থাকে আক্রান্তের সংখ্যা। ১৯৭০ এর আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ১৪৭৩ জন আক্রান্ত হয় ও ৫০২ জন মারা যায়।
১৯৭১ সালের শেষের দিকে ভারতে বাংলাদেশী শরণার্থিদের আশ্রয় শিবিরে গুটি বসন্তের প্রাদুর্ভাব ঘটে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সুপ্ত অবস্থায় তাদের মাধ্যমে দেশে আবার এই রোগ ফিরে আসে এবং ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এরপর গুটিবসন্ত নির্মূলকরণ কর্মসূচি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্বব্যাপী প্রকল্পের অধীনে দিয়ে দেওয়া হয়।
১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রপতির এক আদেশে গুটিবসন্তকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে, গুটিবসন্ত নির্মূলকরণ কর্মসূচিকে সব প্রকার কার্যকরি সহায়তাসহ চালু রাখার নির্দেশ করা হয়। 
প্রতিটি নতুন সংক্রমণ গভীরভাবে পরীক্ষা করে করে চিহ্নিতকরণ ও দমনের সমস্যা খুঁজে বের করা হয়। মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন সমাধানের উপায় এবং নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে এই রোগের সংক্রমণের ঘটনা ১৯৭৫ সালের মে মাসে অত্যন্ত দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। তবে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে হলে প্রতিটা রোগীকেই চিহ্নিত করে করে চিকিৎসা দিতে হবে। তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মিলে একটা কৌশল বেছে নিলো সেটা হচ্ছে গুটি বসন্তের রোগী খুঁজে দিতে পারলে ৫০ টাকা পুরষ্কার। এভাবে রোগীর সংখ্যা যতো কমতে লাগলো ততো বাড়তে লাগলো পুরষ্কার। এভাবে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিলো পুরষ্কারের মূল্যমান। এর নাম দেওয়া হয় Operation small pox zero.

সর্বশেষ ১৯৭৫ সালের ১৬ অক্টোবর বাংলাদেশের শেষ গুটি বসন্ত রোগীটি ধরা পড়ে। ভোলার আড়াই বছর বয়সী এক শিশু, নাম রহিমা বানু। সে-ই ছিলো ভ্যারিওলা মেজরে আক্রান্ত পৃথিবীর সর্বশেষ মানুষ।

এরপর ১৯৭৬ এর ২ জানুয়ারি সরকারিভাবে বাংলাদেশকে গুটি বসন্ত মুক্ত ঘোষণা করা হয়।
তবে তখনও আফ্রিকাতে ভ্যারিওলা মাইনরের বিস্তার ছিলো। ১৯৭৭ সালে সোমালিয়াতে সেটার সর্বশেষ রোগী শনাক্ত হয়। 
১৯৭৯ সালে পৃথিবীকে গুটি বসন্ত মুক্ত ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

কেনো বিলুপ্ত হলো স্মল পক্স?

কারণ এই ভাইরাসের মানুষ বাদে কোনো পোষক (Vector) নেই। মানে, মানুষ বাদে আর কোনো প্রাণীতে এই রোগ হয় না। ফলে যখন পৃথিবীর সকল মানুষের দেহ থেকে এই ভাইরাস মরে গেলো, তখন পৃথিবী থেকেই এটা বিলুপ্ত হয়ে গেলো।

আরো তথ্যঃ
গুটি বসন্তের হাত থেকে বাঁচতেই ভারতবর্ষে শীতলা দেবীর পূজা শুরু হয়।
স্মল পক্সের নাম স্মল হওয়ার কারণ সিফিলিসকে লার্জ পক্স বলা হতো। স্মল পক্সের গোটা সিফিলিসের চাইতে ছোট।