মায়ান মিথোলজিঃ কিভাবে উদ্ভব হলো মানুষের


মানুষের উদ্ভব হলো কোত্থেকে বা কিভাবে? ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞান- সবখানেই এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এ কারণেই পৃথিবীর প্রতিটা বিশ্বাসেই সৃষ্টিতত্ত্ব আলোচিত হয়েছে আলাদাভাবে এবং বিশেষ গুরুত্ব সহকারে। আজ আমরা জানবো আদিম পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধশালী ও সভ্য জাতি মায়ানদের এ ব্যাপারে বিশ্বাস কি ছিলো সেই সম্পর্কে।
খ্রিষ্টের জন্মেরও ২ হাজার বছর আগে উদ্ভব হয়েছিলো মায়ান সভ্যতার। বর্তমান ইয়ুচাতান উপদ্বীপে (মেক্সিকোর তিনটি প্রদেশ আর গুয়াতেমালা ও বেলিজের কিছু অংশ) ছিলো এদের বসবাস। যদিও ঐ এলাকায় উদ্ভূত অন্যান্য সভ্যতার সাথে এটার অনেক কিছুই মিলে যায়, তবুও মায়ানদের আছে বেশ কিছু স্বতন্ত্র কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। চিত্রাঙ্কন, বাসা নির্মাণ, জ্যোতির্বিদ্যা এমনকি লিখিত ভাষাতেও দখল ছিলো তাদের। বিখ্যাত মায়ান ক্যালেন্ডারের নাম সবারই শুনে থাকার কথা। যদিও বলা হয় ভাষা আর ক্যালেন্ডার মায়ানদের নিজস্ব উদ্ভাবন নয়! সে যাই হোক!
মায়ানদের যাবতীয় মিথ আর ঐতিহাসিক তথ্য যে বইতে একত্রে সংকলন করা হয়েছে, তার নাম হচ্ছে পপুল ভাহ।
পপুল ভাহ অনুসারে দেবতারা একবারেই মানুষ সৃষ্টি করতে সফল হননি। এজন্যে মোট চারবার চেষ্টা করা লেগেছিলো।
একদম শুরুতে কিছুই ছিলো না, শুধু ছিলো নিস্তব্ধতা আর নৈশব্দ। বাতাস, মাটি, গাছ, পশু মানুষ কিছুই ছিলো না। একদিকে শুধু ছিলো আকাশ, আর একদিকে ছিলো সমুদ্র বা পানি। 
এসব জায়গায় বাস করতেন দেবতারা।
দেবতারা একসময় এই শূণ্যতার অসীম সম্ভাবনার কথা অনুধাবন করতে পারলেন। 
তখন দুই জায়গা থেকে দুই মহান দেবতা- আকাশ থেকে প্লুমড সার্পেন্ট আর সমুদ্র থেকে হারিকেন একত্র হয়ে ঠিক করলেন যে তারা পৃথিবী সৃষ্টি করবেন। মায়ান বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবতারা মুখে যা বলতেন সেটাই সৃষ্টি হতো। এখানে ভাষা সংক্রান্ত একটা মজার ব্যাপার লক্ষণীয়। মায়ানরা মনে করে, কোনো জিনিসের নাম ঠিক করে সেটা ধরে ডাক দিলেই জিনিসটা সৃষ্টি হয়। সাধারণত একটা জিনিস তৈরি হওয়ার পরে সেটার নাম দেওয়া হয়, কিন্তু মায়ান ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্টো।
হারিকেন তাই ডেকে উঠলেন, ‘পৃথিবী।’ আর ওমনি সমুদ্রের ভিতর থেকে কুয়াশার মতো করে মাটি উত্থিত হলো। পাহাড়ের কথা ভাবতেই বিশাল বিশাল পাহাড় আবির্ভূত হলো। 
গাছের কথা ভাবতেই জন্ম নিলো গাছ।

অন্যান্য দেবতারা এই দুজনকে সবকিছু সৃষ্টি করতে সাহায্য করেন। পৃথিবী সৃষ্টির পরে এর নিজেরও একটা হৃৎপিণ্ড  দেওয়া হয়, যেটাকে বলা হয় হার্ট-অফ-আর্থ।
পৃথিবী আর আকাশকে আলাদা করতে দেবতারা মাটিতে একটা লম্বা সেইবা (Ceiba) গাছ লাগিয়ে দেন, ফলে মাটিতে সমস্ত সৃষ্টির জন্যে জায়গা হয়ে যায়। গাছটার শিকড় মাটির নিচে প্রায় নয় স্তর গভীরে নেমে যায়। এই নয়টা স্তর হচ্ছে মায়ান পাতালের নয়টা স্তর। আর মাটির উপরে কান্ড বাড়তে বাড়তে এর শাখা-প্রশাখা আকাশের তেরটা স্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় দেবতারা খুব সন্তুষ্ট হন।
কিন্তু দেবতাদের স্তুতি গাওয়ার বা তাদের মহত্বের গুণগান করার মতো কেউ ছিলো না। সে কারণেই একদিন তারা ঠিক করলেন যে পৃথিবীতে তাদের উপাসনা করবে এমন প্রাণী সৃষ্টি করবেন।

প্রথমে যেগুলো সৃষ্টি করা হলো সেগুলো আমরা পশু হিসেবে চিনি- পাখি, হরিণ, চিতা বাঘ, সাপ- এইসব আরকি।
সৃষ্টির পর প্রত্যেককে নিজস্ব বাসস্থান দেওয়া হয়। ‘হরিণ, তোমরা নদীর ধারে থাকবে। পাখিরা, তোমাদের বাসা হবে গাছের ডালে। ঝাঁকে ঝাঁকে বংশ বৃদ্ধি করে ছড়িয়ে পড়ো,’ আদেশ দেন হারিকেন।
তারপর দেবতাদের দিকে প্রার্থনা করার আদেশ দেওয়া হয় পশুদের।
কিন্তু জন্তুগুলো দুর্বোধ্য কিছু ধ্বনির বাইরে শব্দ করতে পারল না। কিচির মিচির আর গর্জন শোনা গেলো শুধু।
এদের দ্বারা দেবতাদের উপাসনা সম্ভব না। 
বিরক্ত হয়ে দেবতা দুইজন ঘোষণা দিলেন যে, যারা তাঁদের উপাসনা করবে এরা আজীবন তাদের সেবা করবে। আর জঙ্গলই হবে এসব পশুদের আবাস।

দেবতারা আবার চেষ্টা শুরু করলেন। এবার প্রাণ সৃষ্টিতে তিনি ব্যবহার করলেন কাঁদা। 
কিন্তু এই কাঁদার মানবগুলোর কোনো আত্মা ছিলো না, আর দেখতেও ছিলো বিদঘুটে। কিম্ভূতকিমাকার একটা অবয়ব ছিলো এদের। কেমন ল্যাগব্যাগ করে করে চলাচল করতো, মাথা সবসময় হেলে থাকতো একদিকে। কথা বলতো এলমেলো। বংশবৃদ্ধি ক্ষমতাও ছিলো না। আর সবচে বড় ব্যাপার ছিলো যে পানি লাগলেই গলে গলে পড়ে যেতো। 
তাই চিরতরে এদেরকে পানিতে মিশিয়ে দেওয়া হলো।

তৃতীয়বার চেষ্টা শুরু করলেন দেবতারা।
আর এ ব্যাপারে পরামর্শের জন্যে মায়ান জাতির পরদাদা আর পরদাদি জিপিয়াকক আর জুমুকেনিয়ারকে ডেকে পাঠানো হলো। তারা ছিলেন সবচে জ্ঞানী আত্মা।
দেবতারা আদেশ দিলেন, ‘গণনা করে দেখো তো, কি দিয়ে মানুষ বানালে সবচে ভালো হবে?’
জিপিয়াকক আর জুমুকেনিয়ার শস্য দানা আর প্রবাল বীজের উপর নিজেদের হাত বুলালেন।
‘কি এমন জিনিস বানানো যায় যা কিনা কথাও বলবে আবার প্রার্থনাও করবে?’ পরদাদা জানতে চাইলেন।
‘কোন জিনিসটা একই সাথে পোষক এবং প্রদেয়ক হবে?’ জানতে চাইলেন পরদাদি।
দিনের পর দিন তারা গণনা করেই চললেন, যাতে মানুষ সৃষ্টির জন্যে উপযুক্ত জিনিসের সন্ধান মেলে। 
অবশেষে উত্তর পেলেন তারা, ‘কাঠ দিয়েই মানুষ বানালে ভালো হবে। তারা আপনার নামে প্রার্থনা করবে। দুনিয়ায় হেঁটে বেড়াবে এবং বংশ বৃদ্ধি করবে।’
‘তবে তাই হোক,’ বললেন প্লুমড সার্পেন্ট।
বলামাত্র তা পালিত হলো। কাঠ থেকে খোদাই হয়ে সৃষ্টি হলো পুতুলের মতো দেখতে কিছু মানুষ।

কাঠমানবদের গড়ন শক্তপোক্ত হলেও দেহ ছিলো একদম চিমসানো। না ছিলো রক্ত, না হতো ঘাম। ফলে চলাফেরায় সমন্বয় ছিলো না। সবচে বাজে হচ্ছে এদের কোনো স্মৃতি ছিলো না, আবেগ বলতে ছিলো না কিছু। এ কারণে দেবতাদেরকে এক ফোঁটা মানতো না তারা। পৃথিবীতে হেঁটে চলে বেড়াতো ঠিক কিন্তু গঠনমূলক কিছুই করতো না। আর পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীর উপর অত্যাচার করতো খুব।
‘আমরাতো এজন্যে মানুষ বানাইনি,’ রেগে গেলেন দেবতারা।
তারা ঠিক করলেন এদেরকে ধ্বংস করে দেবেন।
হারিকেন বিশাল একটা ঝড়ের সৃষ্টি করলেন। দিন রাত বৃষ্টি চলতেই থাকলো। এতো ভয়াবহ বন্যা হলো যে পৃথিবী কালো হয়ে গেলো। এটা অনেকটা নূহের (আ) প্লাবনের মতোই, তবে পার্থক্য হচ্ছে এই বন্যাটা মানুষের অশুভ কাজের ফলাফল ছিলো না বরং এট ছিলো স্রষ্টার ঠিকমতো মানুষ বানাতে না পারার ব্যর্থতার জন্যে।
যারা বন্যার হাত থেকে বেঁচে গেলো তাদেরকে মারার জন্যে হারিকেন দানব প্রেরণ করলেন। ব্লাডলেটার নামের এক দানো তাদের মাথা থেকে ধড় আলাদা করে ফেললো। গাউজার অফ ফেস তাদের চোখ তুলে নিলো আর চিতাবাঘ এসে তাদের হাত পা ছিড়ে খেতে লাগলো। 
দানবের হাত থেকে যারা বাঁচলো তাদের উপর এবার গলিত আলকাতরার মতো জ্বলন্ত আগুন বৃষ্টি পড়তে লাগলো।
বনের পশুরা কাঠমানবদের বাসায় আক্রমণ করলো। ‘তোরা আমাদেরকে আমাদের বাসা ছাড়া করেছিলি, আজ আমরা তোদের বাড়ি দখল করবো।’ গজরাতে গজরাতে বললো তারা। পোষা কুকুর আর টার্কি মুরগি বলে উঠলো, ‘তোরা আমাদের সাথে শয়তানি করেছিলি, আজ আমরা তোদেরকে খাবো।’
এমনকি তাদের বাসনপত্র আর গম পেষার যাতাগুলোও কথা বলে উঠলো, ‘আমরা তোদেরকে পুড়িয়ে মারবো আর পিষে মারবো। ঠিক এতোদিন আমাদের সাথে যা করেছিস।’
আতঙ্কিত হয়ে কাঠমানবেরা পালাতে চাইলো, কিন্তু কেউ তাদেরকে আশ্রয় দিলো না। বাসার ছাদে উঠলে ছাদ ধ্বসে পড়তে লাগলো, গাছে উঠলে গাছ ঝাকি দিয়ে ফেলে দিতে লাগলো। গুহার দিকে গেলে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যেতে লাগলো। 
শেষমেশ সামান্য যে কয়জন বেঁচে ছিলো তাদের চেহারা নষ্ট হয়ে গেলো, আর রূপান্তরিত হলো বানরে। এ কারণেই মানুষ আর বানরে এতো মিল। মানব সৃষ্টির পরীক্ষায় বাতিল হয়ে যাওয়া নকশা এরা।

এতোকিছুর পরেও দেবতারা আশাহত হলেন না। মানুষ সৃষ্টি করতেই হবে, কারণ একমাত্র মানুষই সঠিকভাবে তাদের আরাধনা করতে পারবে। আর এরা সৃষ্টি হলেই আকাশে সূর্য, চন্দ্র আর তারা দৃশ্যমান হবে। দেবতারা তাই সর্বশেষ প্রচেষ্টা চালালেন। আর এবারের প্রচেষ্টা যাতে সফল হয় সেজন্যে তাঁরা চারটা প্রাণী প্রেরণ করলেন। সেগুলো হলোঃ শিয়াল, তোতা, কয়োটি আর কাক। এদের কাজ ছিলো সৃষ্টি কার্যটা সম্পন্ন করার জন্যে একটা উপযুক্ত জায়গা খুজে বের করা। ওরা জায়গাটা খুজে পেলো আর সেখান থেকে ভুট্টা আর জোয়ার তুলে নিয়ে এলো। তারপর সেগুলো এক বৃদ্ধা মহিলাকে দিলো পিষে ময়দা তৈরি করে দেওয়ার জন্যে। সেই ময়দার খামির দিয়ে দেবতারা চারজন পুরুষ ও চারজন মহিলা তৈরি করলেন।
এরা হচ্ছে আদি মাতা-পিতা। এবারের পরীক্ষা সফল হলো। আদি মাতা-পিতা খুব দ্রুত তাদের চারপাশের জগত সম্পর্কে বুঝে নিলেন।

তাদেরকে জ্ঞান ও বুদ্ধি দান করা হলো। শুরুতে মানুষেরা সবকিছুই করতে পারতো। উড়তে পারতো, দৃষ্টিক্ষমতা এতো শক্তিশালী ছিলো যে সমুদ্রের ওপারেও দেখতে পেতো। এমনকি পাথরের অভ্যন্তরে কি আছে সেটাও দৃষ্টিগোচর হতো। 
শুরুতে মানুষের এই জ্ঞান গরিমা দেখা দেবতারা খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন কিন্তু দেখা গেলো কিছুদিন পরেই মানুষেরা সেগুলো দেবতাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা শুরু করেছে। এভাবে চলতে থাকলে তারা আর দেবতাদের কথা মেনে চলবে না, সেজন্যে হারিকেন তাদের দৃষ্টি কমিয়ে দেন।
এভাবেই তৈরি হয় দীর্ঘস্থায়ি, বর্তমান যুগের সত্যিকার মানুষ।

লোকেরা বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে পৃথিবী পূর্ণ করতে লাগলো, কিন্তু তখনও সূর্য ওঠেনি। তাই সবাই তখন অন্ধকারে উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতো। অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে মানুষেরা সূর্যের সন্ধানে পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করলো। কিন্তু শীঘ্রই ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়লো সবাই। আদি মাতা-পিতা তখন পাহাড় চূড়ায় উঠে দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করা শুরু করেন। 
লোকজনের দুর্দশা আর প্রার্থনা দেখে দেবতারা অভিভূত হয়ে পড়েন। ফলে সূর্য উদিত হয়, লোকজন সবাই হাঁটু মুড়ে বসে কৃতজ্ঞতা জানায়। শুরুতে সূর্যের কিরণ এতো বেশি গরম ছিলো যে সহ্যই করা যেতো না। তবে ধীরে ধীরে লোকজন সূর্যের উষ্ণতা আর আলোয় অভ্যস্ত হয়ে যায়। আর ভুট্টা এবং অন্যান্য ফসল ফলানো শুরু করে।

যদিও পপুল ভাহ-এর বর্ণনার সাথে অন্য অনেক সৃষ্টি কাহিনীরই মিল আছে, কিন্তু এই কাহিনীটার সবকিছুতেই একটা নতুনত্ব আছে। মায়ানদের খাদ্য তালিকায় ভুট্টার এতো গুরুত্বের কারণও এই কাহিনী থেকে স্পষ্ট হয়।