ডেভিড ইয়ং : মাশরাফির টিকে থাকার রহস্য


চিত্রা নদীতে সাঁতার কেটে, বন্ধুদের সঙ্গে হৈ হল্লোর করে বেলা কাটতো কিশোর কৌশিকের। দস্যিপনায় তার জুড়ি মেলা ছিলো ভার। সেখান থেকে প্রায় ধুমকেতুর মতো কৌশিক চলে এলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের উত্তপ্ত ময়দানে। চোখে-মুখে কৈশোরের ছাপ নিয়ে অভিষেক হলো টেস্টে। নড়াইলের কৌশিক হয়ে গেলো বাংলাদেশের মাশরাফি।

দিনে দিনে মাশরাফি হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের আবেগের নাম। তার হাত ধরে রচিত হলো কতো ইতিহাস। ধরা দিলো কতো গৌরবের মুহূর্ত। মাশরাফি হয়ে উঠলেন এক বিজয়ী চেতনার নাম। অথচ এই মাশরাফি শেষ হয়ে যেতে পারতেন অঙ্কুরেই। ধুমকেতুর মতোই আবির্ভাবের পর হারিয়ে যেতে পারতেন মহাকালের অতল গহ্বরে। তার ক্রিকেট প্রতিভা বা নেতৃত্ব গুণের সর্বোচ্চ প্রকাশ দূরে থাক, সামান্য প্রকাশও হয়তো দেখা হতো না বিশ্ববাসীর।

মাশরাফি যখন আবির্ভুত হন, বাংলাদেশ তখনও সত্যিকারের কোনো পেসারের সন্ধান পায়নি। ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারতেন বলে, শুরুতেই মাশরাফি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের স্বপ্নের সারথী। সে সময়ের কোচ-নির্বাচকরা এতেই করে ফেলেছিলেন বড় এক ভুল। যথেচ্ছ ব্যাবহার করা হচ্ছিলো মাশরাফিকে।

যা সহ্য করেনি তার শরীর। প্রথম বিদ্রোহ করে উঠে মাশরাফির পিঠ। পিঠের ইনজুরিতে পড়ে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বছরেই (২০০২ সাল) মাঠের বাইরে ছিটকে যান তিনি। সুস্থ হওয়ার পথে পড়েন হাঁটুর ইনজুরিতে। যার ফলে আট মাসের জন্য খেলার বাইরে ছিটকে যান তিনি। শুরু হয় মাশরাফি বিন মর্তুজার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিঘ্নবহুল অধ্যায়, শুরু হয় তার ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়।

২০০২ সালে প্রথমবার হাঁটুর অস্ত্রোপচারের জন্য অস্ত্রোপচারের টেবিলে শুতে হয় মাশরাফিকে। পরের বছর আবার ক্রিকেটে ফেরেন তিনি। কিন্তু হাঁটুর সমস্যা তখনো পুরোপুরি সারেনি। তখনই দৃশ্যপটে হাজির হন অস্ট্রেলিয়ান শল্যবিদ ডক্টর ডেভিড ইয়ং। দ্বিতীয়বার মাশরাফির হাঁটুতে ছুরি চালান তিনি। আবার লম্বা সময় পর ক্রিকেটে ফেরেন মাশরাফি। কিছুদিন পর অন্য হাঁটুতে চোট এবং আবার অস্ত্রোপচার এবং আবার মাশরাফির ফেরার লড়াই। চলতে থাকে অদম্য এক যুবকের অবিশ্বাস্য এক লড়াই।

ডেভিড ইয়ং সে সময় সংবাদ মাধ্যমে একবার বলেন যে, মাশরাফি যে ধরনের চোটে পড়ছেন এবং অস্ত্রোপচারের পর আবার ফিরে আসছেন, এ ধরনের একটা ইনজুরিই একজন অ্যাথলেটের ক্যারিয়ার শেষ করে দিতে পারে।

বিস্ময়ের ব্যাপার হলো ডেভিড ইয়ং ওই কথা বলার পর আরো চারবার মাশরাফির হাঁটুতে ছুরি চালাতে হয়েছে তার! এর প্রায় প্রত্যেকবারের অস্ত্রোপচারই ছিলো মূলত হাঁটুর ‘রিকনস্ট্রাকশন’! প্রতিবার অস্ত্রোপচারের পর ডেভিড ইয়ং ধরে নিতেন, মাশরাফির বোধহয় আর ক্রিকেটে ফেরা হবে না। কিন্তু শরীর-বিজ্ঞানের সব আন্দাজ ও ইতিহাসকে ভুল প্রমাণ করে মাশরাফি ঠিকই আবার ফিরে আসতেন। শেষ পর্যন্ত ডেভিড ইয়ং একবার বলে দিলেন যে, মাশরাফির শরীরিক গঠন আসলে আর দশজন মানুষের মতো নয়। ফিরে আসার মহাবিস্ময়কর ঘটনাগুলো এ কারণেই ঘটাতে পারছেন তিনি।

সবার থেকে মাশরাফি কোথায় আলাদা— তা অবশ্য কখনো বলেননি ডেভিড ইয়ং। তিনি বরং সামনে এনেছেন মাশরাফির অদম্য মানসিক শক্তির কথা। নতুন বছরের (২০১৮) ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে ঢাকা এসেছেন অস্ট্রেলিয়ান এই অর্থোপেডিক সার্জন। তিনি ঘুরে গেছেন বিসিবিতেও। সেখানে সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি কথা বলেছেন মাশরাফির বিষয়ে।

ডেভিড ইয়ং বলেন, ‘মাশরাফি পেশাদার এবং সে তার দেশ ও দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। আমি এটা ভেবে আনন্দিত যে, তার ক্যারিয়ারে আমার যৎসামান্য সম্পৃক্ততা আছে। বেশ কয়েকবার সে ইনজুরিতে পড়েছে এবং তাকে আমি সেরে উঠতে সাহায্য করেছি। তার হাঁটুতে গঠনগত কিছু পরিবর্তনও করতে হয়েছে। আত্মনিবেদন এবং যথাযথ পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কারণে সে টিকে গেছে এবং তার ক্যারিয়ার বিস্ময়করভাবে দীর্ঘ হয়েছে।’

ডেভিড ইয়ং মাশরাফির ক্যারিয়ারে তার সম্পৃক্ততাকে যতোই ‘যৎসামান্য’ বলুন না কেনো, মাশরাফি তা মনে করেন না। মাশরাফি বরং মনে করেন, ডেভিড ইয়ংয়ের সুচিকিৎসাই তাকে ক্রিকেটার হিসেবে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।

সম্প্রতি ডেভিড ইয়ংয়ের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে মাশরাফি যা বলেছেন, তাতেই বোঝা যায় তার ক্যারিয়ারে অস্ট্রেলিয়ান এই শল্যবিদের অবদান কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। মাশরাফি বলেন, ‘এই যে আমি এখনো খেলে যাচ্ছি, কারণ উপরে আল্লাহ আছেন আর উছিলা হিসেবে ডেভিড ইয়ং আছে। আমার ছয়টি অস্ত্রোপচার হয়েছে ওর হাত দিয়ে। শুধু আমি না, আমাদের ক্রিকেটারদের মধ্যে যারা পা ও পিঠের ইনজুরিতে পড়েছে, ও তাদেরও চিকিৎসা করেছে। ও বাংলাদেশ ক্রিকেটের অদৃশ্য একজন বন্ধু। ও যতোবার আমার অস্ত্রোপচার করেছে প্রত্যেকবার অবস্থা খুব জটিল ছিলো। কিন্তু ও খুব যত্ন নিয়ে সেবা করেছে।’

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে জন্মগ্রহণ করা ও বেড়ে উঠা ডেভিড ইয়ং যে কেবল মাশরাফির টিকে থাকার রহস্য, তা কিন্তু নয়। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কারও বহু ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার দীর্ঘ হয়েছে তার সুচিকিৎসার কারণে। শ্রীলঙ্কায় তো এক সময় তার নামই হয়ে গিয়েছিলো মিস্টার ফিক্স!

অর্থোপেডিক চিকিৎসা চর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন সেবামূলক কাজে ব্যস্ত থাকা ডেভিড ইয়ং চিকিৎসা করেছেন অরবিন্দ ডি সিলভা, কুমার সাঙ্গাকারা, মারভান আতাপাত্তু, চামিন্দা ভাস, মুত্তিয়া মুরালিধরণ, সনাথ জয়সুরিয়া ও ল্যাসিথ মালিঙ্গাকেও। তার কারণেই এরা ইনজুরির ধকল সামলে বছরের পর বছর ক্রিকেট খেলে গেছেন।

চিকিৎসক হিসেবে ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ার বাঁচিয়ে দেয়ার মতো কাজ করে অসীম আনন্দ পান ডেভিড ইয়ং। ছোট বেলায় ওপেনিং ব্যাটসম্যান এবং উইকেটকিপার হিসেবে খেলতেন তিনি। হয়তো এ কারণে ক্রিকেটারদের প্রতি বাড়তি এক মমতাবোধই কাজ করে ডেভিড ইয়ংয়ের মনে।

শুধু ক্রিকেটারদের নিয়েই পড়ে থাকেন তিনি, তাও কিন্তু নয়। তার রোগীদের তালিকায় আছেন ফুটবলার, বেসবল খেলোয়াড়, টেনিস খেলোয়াড়ও। নিজের কাজের প্রেরণা নিয়ে বলতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে ডেভিড ইয়ং কুমার সাঙ্গাকারার একটি উদাহরণ দেন।

সাঙ্গাকারা এক সময় আইনজ্ঞ হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু ক্রিকেটের প্রতি তার এতোই টান ছিলো, যার কারণে আইন বিষয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে তিনি ক্রিকেটকেই বেছে নেন। ডেভিড ইয়ং বলেন, ‘সাঙ্গাকারা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা ছিলো অনেকটা জুয়ার মতো। এ কারণেই আমি মনে করি একজন অ্যাথলেটের ইনজুরি সারিয়ে তোলা আমার দায়িত্ব, যাতে তারা তাদের চ্যালেঞ্জগুলো জিততে পারে।’

ডেভিড ইয়ং এভাবে নিজেকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন বলেই হয়তো বাংলাদেশ কৌশিক নামের একজন কিশোরের মধ্যে মাশরাফি বিন মর্তুজার মতো একজন মহীরুহকে পেয়েছে। এখন তাকে দেখেই এই দেশের কোটি কোটি কিশোর কৌশিক থেকে মাশরাফি হয়ে উঠার মতো মহৎ স্বপ্ন দেখতে পারে। তাদের ওই স্বপ্নেও নিশ্চয় ডেভিড ইয়ং সম্পৃক্ত থাকছেন এবং সেই সম্পৃক্ততা কোনোভাবেই যৎসামান্য নয়!