বই পরিচিতিঃ কাব্য আমপারা


মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্যিক জীবনের নজরুলকে আমরা কত পরিচয়েই না চিনি – কবি, গল্পকার, নাট্যকার, গীতিকার, সুরকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা, আরও কত ! কিন্তু তাঁর অনেক বড় এক পরিচয় আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করে যাই । আর তা হল – অনুবাদক। অথচ নজরুলের সকল পরিচয়ের মধ্যে এটি অনেক বেশি আলোচিত হবার দাবীদার। কারণ, তিনি অনুবাদ করার জন্য যে গ্রন্থটি বেছে নিয়েছিলেন তা সাধারণ কিছু নয়, বরং পবিত্র কোরান শরীফ। এবং তাও আবার পদ্যানুবাদ !

একথা স্বীকার্য এবং প্রমাণিত যে, নজরুলের মত এত ধর্মীয় উদ্ধৃতি বা রেফারেন্স বাংলা সাহিত্যে আর কোন সাহিত্যিক ব্যবহার করেননি। সে পুরাণ থেকেই হোক, বা হাদিস-কুরান থেকেই হোক – নজরুল তা প্রয়োগে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। আরবি, ফারসি, সংস্কৃত - এই তিন ভাষাতেই যেন ছিল তাঁর অসামান্য বিচরণ।

হিন্দু পুরাণ ও দেবদেবীর বয়ান, বিশেষ করে শ্যামা সঙ্গীত রচনার কারণে কিছু কূপমণ্ডূক ফতোয়াবাজ তাঁকে “কাফের কবি” আখ্যা দিলেও “কাব্য আমপারা” অনুবাদের যে কারণ তিনি ব্যাখ্যা করেছেন তাতে এটা স্পষ্ট যে, বঙ্গীয় মুসলমান সমাজে কোরান মুখস্থ পাঠের চাইতে কোরানের শিক্ষার উপলব্ধির প্রতি তিনি অধিক আগ্রহী ছিলেন। তিনি স্বয়ং এ কাব্যের মুখবন্ধে বলেছেন যে, কোরান মজিদের ভেতর যে অমূল্য মণিমাণিক্য আছে তা আরবি ভাষায় চাবি দেয়া। আমাদের বাঙ্গালি মুসলমানেরা তা না বুঝেই শুধু অন্ধ ভক্তিতে নাড়াচাড়া করি। ফলে এর প্রকৃত রূপ-রস আমরা টের পাই না। তাঁর মতে কোরান, হাদিস, ফেকাহ প্রভৃতির বাংলা ভাষায় অনুবাদ হলে বাঙ্গালি মুসলমান সমাজের অশেষ কল্যাণ হবে। তাঁর এও বিশ্বাস ছিল যে, যদি কোরান মজিদের সরল কাব্যানুবাদ করা যায়, তবে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তা বুঝে আনন্দের সাথে পাঠ করবে এবং এর মূল রসের প্রতি অনুরক্ত হবে। আর তাই তিনি পবিত্র কোরানের বাণীকে অক্ষুণ্ণ রেখে এর সহজ বাংলায় কাব্যানুবাদ শুরু করেন। তারই ফসল আটত্রিশটি সুরার অপূর্ব সুন্দর এবং সহজ পদ্যে অনুবাদ। প্রতিটি সুরার নামের অর্থও তিনি অনুবাদ করে দিয়েছেন। দিয়েছেন তাঁর ব্যবহার করা শব্দের অর্থও।

শুধু এক “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম”-কেই তিনি বিভিন্ন ভাবে অনুবাদ করেছেন। কোথাও লিখেছেন -
”শুরু করিলাম লয়ে নাম আল্লার, করুণা ও দয়া যাঁর অশেষ অপার।“ 
কোথাও লিখেছেন -
” শুরু করি নামে সেই আল্লার, করুণা-নিধান যিনি কৃপার পাথার।“ 
আরেক সুরার শুরুতে- 
“শুরু করি শুভ নাম লয়ে আল্লার, দয়া করুণার যিনি মহা-পারাবার।“ 
এভাবে আরো কতভাবে ! প্রতিটাই তাঁর কাব্যপ্রতিভার পাশাপাশি খোদাপ্রীতিকে জানান দেয়।

সুরা ফাতেহার অনুবাদটি এখানে তুলে দিলাম শুধু এর সহজিয়া মাধুর্যটি বুঝাতেঃ ( সুরা – শ্লোক, ফাতেহা – উদঘাটিকা )

" শুরু করিলাম লয়ে নাম আল্লার,
করুণা ও দয়া যাঁর অশেষ অপার।

সকলি বিশ্বের স্বামী আল্লার মহিমা,
করুণা কৃপার যাঁর নাই নাই সীমা।
বিচার-দিনের বিভু ! কেবল তোমারি
আরাধনা করি আর শক্তি ভিক্ষা করি।
সরল সহজ পথে মোদেরে চালাও,
যাদেরে বিলাও দয়া সে পথ দেখাও।
অভিশপ্ত আর পথ-ভ্রষ্ট যারা, প্রভু,
তাহাদের পথে যেন চালায়ো না কভু ! "

কিংবা, সুরা ইখলাসের অনুবাদটি পড়িঃ ( ইখলাস – বিশুদ্ধ )

" শুরু করিলাম পুত নামেতে আল্লার,
শেষ নাই সীমা নাই যাঁর করুণার ।

বল, আল্লাহ্‌ এক ! প্রভু ইচ্ছাময়,
নিষ্কাম নিরপেক্ষ, অন্য কেহ নয়।
করেন না কাহারেও তিনি যে জনন,
কাহারও ঔরস-জাত তিনি নন ।
সমতুল তাঁর,
নাই কেহ আর । "

অসাম্প্রদায়িকতার মূর্ত প্রতীক, সাম্য ও মানবতার কবি নজরুলের এ আটত্রিশটি সুরার অনুবাদ আমাদের জাতীয় সম্পদ। তাঁর দেখানো পথ ধরে পরবর্তীতে অনেকেই এ উদ্যোগে এগিয়ে এসেছেন। আজ পান্না চৌধুরীর পুরো কোরান শরীফের কাব্যানুবাদও আছে। কিন্তু নজরুলের সেই হৃদয়ছোঁয়া শব্দাবলী আজো অম্লান।

নজরুলকে ভালবাসতে হলে শুধু "বিদ্রোহী", "চল চল চল", "খুকী ও কাঠবিড়ালি" বা "লিচু চোর"-এ সীমাবদ্ধ না থেকে , কিংবা 'রুটিবানানো দুখু মিয়ার কী কী সুযোগ পাইলে কী কী হইত' - জাতীয় চিন্তায় ডুবে না থেকে নজরুলকে পড়াই উত্তম।

নজরুল ইন্সটিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত “কাব্য আমপারা” অত্যন্ত সুন্দর মনকাড়া প্রচ্ছদে আর মাত্র ৮০ টাকা গায়ের দামে সহজলভ্য। ধর্মভীরু মুসলমান বা নজরুলপ্রেমী শুধু নয়, কাব্যপ্রেমী যে কোন বইপোকার জন্য এ বইটি আনন্দের উৎস হতে বাধ্য।




প্রথম প্রকাশঃ 1933
কাব্য আমপারা

প্রাপ্তিস্থানঃ