ফ্যোয়া একটি দ্বীপের নাম (প্রথম পর্ব)


জার্মানির মোট ষোলটা ফেডারেল স্টেট আছে। যেমন হামবুর্গ, বার্লিন, মিউনিখ। এখন হামবুর্গের পাশের ফেডারেল স্টেটের নাম রেখেছে শ্লেসভিক হলস্টাইন। ফ্যোয়া হচ্ছে  এই শ্লেসভিক হলস্টাইনের অন্তর্গত একটি নর্থ ফ্রিজিয়ান দ্বীপ।   
সাদরি ভাই আর ডায়না আমাদের ফ্যামিলী ফ্রেন্ড এবং ফ্যোয়ায় বাঙ্গালীদের গোঁড়াপত্তন ইতিহাসের দুইজন মহান অংশীদার। শুধু বাঙালি না, হিসেবটা উপমহাদেশ ধরেই হবে। সে সময় বোধহয় তারা  ছাড়া আর একটি মাত্র দক্ষিণ এশীয় পরিবার ওখানে বাস করত। তাও ওদেরই আত্মীয়। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে গিয়ে চারে এসেছে। এবং এরা এখনো সবাই সবার আত্মীয়।

গৃহী মানুষের যাযাবর জীবন 

ভিক আউফ ফ্যোয়াতে মানুষ গরমের সময় সৈকতে পা ডোবাতে যায়। উত্তর সাগরের একাংশে  অবগাহনের জন্যেও যায়। শীতেও যে যায় না তা না। যেমন আমার ফ্যোয়ার সাথে প্রথম দেখা কড়া শীতের ভেতর। তীব্র লিকারের কড়া চায়ের চেয়ে বেশী কড়া শীত। এই শীতের বাতাসে এমন তেজ, সূর্যের দেখা পাওয়ার জন্য চোখে জ্বালা ধরে যায়। একটুখানি উষ্ণতার জন্য ইচ্ছেরা বেসামাল ছলকে ওঠে। 

হিমযুগে পথের বিবাগী না হবার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থেকেও সব ভুলে আবার সংসার গুছিয়ে ভাঁজ করলাম। আর আড়মোড়া ভাঙ্গা একটা ছুটির দিনের মহাশীতসকালে পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে দিলাম। যাচ্ছি একটা দ্বীপে। আমরা দু´ জন যাচ্ছি ভিক আউফ ফ্যোয়াতে। শুধু ফ্যোয়া ডাকলেও অসুবিধা নাই। তিতাস একটি নদীর নামের মত ফ্যোয়া একটি দ্বীপের নাম।

যাচ্ছি একটা দ্বীপে। ভিক আউফ ফ্যোয়াতে। শুধু ফ্যোয়া ডাকলেও অসুবিধা নাই। তিতাস একটি নদীর নামের মত ফ্যোয়া একটি দ্বীপের নাম।

আমরা সড়কপথে আড়াই থেকে তিনঘণ্টা লাগিয়ে আরও উত্তরের দাগেব্যুল গেলাম। মাঝে ছিল কিয়েল, ফ্লেন্সবুর্গের তুষারে মোড়া ল্যান্ডস্কেপ। যথারীতি উইন্ডটারবাইনের ঘোরাঘুরি তো ছিলই। পুরো জার্মানিতে ছাব্বিশ হাজারেরও বেশী উইন্ডটারবাইনের দেখা মিলবে। এরা সবাই মিলে বাতাসের শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে পুরোদেশে মোটের ওপর প্রায় আঠারো শতাংশ বিদ্যুৎ সাপ্লাই দিয়ে যাচ্ছে। খারাপ না।

In winter you have the ships almost to yourself.

সেই ভালবাসার রাইন নদীটার ওপর ছিল ছোট্ট একটা সেতু। পরিচিত কাউকে দেখলে আমরা যেমন দূর থেকে হাত নেড়ে এবং গলা উঁচু করে কুশল জিজ্ঞেস করি, “কি অবস্থা? কেমন চলছে?” সেতু পাড়ি দেবার সময় রাইনের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম। রাইনও জানিয়েছে যেন, “বোলোনা আর! শীত যা পড়েছে! জমে যাচ্ছি একদম। হাত পা খুলে বইতে পারছিনা কত দিন হল!” সমব্যথি হলাম, তবে শীতার্ত হাতদুটো  ছুঁয়ে দেখা গেল না এবারো। দাগেব্যুলে অপেক্ষা করছে ফেরী।

ফেরীবন্দরের ওখানটায় গাড়ি নির্দিষ্ট জায়গায় পার্ক করেও ফেরী চড়া যাবে আবার গাড়ি সাথে নিয়েও যাওয়া যাবে। ইচ্ছা। সাথে নিলাম না। আমরা দুই সদস্যবিশিষ্ট ক্ষুদ্র দল। সাদরি ভাইয়ের গাড়িতেই এঁটে যাব। তাছাড়া দরকার পড়লে মাত্র সাড়ে বার কিলোমিটার দ্বীপে আদর্শ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট  হিসেবে ট্রেন না চললেও বাস তো চলবে।
দুইদিনের জন্য একটা হোটেলের নীচে আমরা গরীবের পঙ্খীরাজটাকে রাখার বন্দোবস্ত করলাম। দেড়শ মিটারের মত দূরত্বে ফেরীঘাট। ফেরী ছাড়তে খুব বেশী বাকি নেই। পুরনো অভিজ্ঞতা বলছে আমরা সম্ভবত এই ট্রিপেও লাস্ট মিনিট প্যাসেঞ্জার হতে পারি। আবার ফেরী মিস করতেও পারি। পরেরটা পাওয়া যাবে অন্তত দুই ঘণ্টা পরে। ঝেড়ে দৌড় দেয়া দরকার।

নোঙ্গর ফেলি ঘাটে ঘাটে

পার্কিং প্লেস থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত দেখার মত জিনিসপত্র খারাপ ছিল না। আমার তো এইসব দেখতেই ভাল্লাগে। এই যে ছোট ছোট পুরনো দিনের আবহ ধরে রাখা একতলা- দোতলা হোটেল, রেস্তোরাঁ- ক্যাফে, পাথরের ঢিবি, ন্যাড়া মাথার উৎকর্ণ গাছ, সেই সঙ্গে বারো রকমের মানুষ তো বটেই। আমার বাঁ পাশ দিয়ে আবার বন্দর পর্যন্ত চলে গিয়েছে রেল লাইন। অল্প কয়েকটা বগি নিয়ে রেলগাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল পানির সীমানার একটু আগে। দ্রুত পায়ে হাঁটার সময় সময় ফ্রিজিয়ান স্পেশাল ছাদ দেখতে গিয়ে সামান্য গতি মন্থর হল। লাল টালির গতানুগতিক ছাদের বদলে খড়, নলখাগড়া দিয়ে বানানো কালো ধরণের থ্যাচড ছাদগুলো এখনো হারিয়ে যায়নি। অনেকেই আবার গাঁয়ের পল্লীপনাকে ভালবেসে নতুন করে খড়গাদার আচ্ছাদনের নীচে বাসা বাঁধতে পছন্দ করছে।

ফ্রিজিয়ান ছাদের নমুনা

ঐ দূর থেকে নাম ধরে ডাকাডাকি শুনলাম। গুরুতর অভিযোগও শুনলাম। আমি নাকি রাস্তার ওপর তথ্যচিত্র টাইপ ধীরগতির সিনেমা দেখে বেড়াই। অভিযোগ সত্য হলেও এমনিতে পাত্তা দিতাম না, তবে ফেরী ছাড়ুক সেটা এই মুহূর্তে চাচ্ছি না। উত্তর সাগরের ইন্টারটাইডাল এলাকার নাম ওয়াডেন সী। এই ওয়াডেন সীতে ভাসার অভিজ্ঞতা নেয়ার জন্য কফিশপে বসে অপেক্ষা প্রলম্বিত করতেই বরং আপত্তি লাগছিল। তাই আর কি, সিনেমার মাঝখানে সামান্য বিরতি দিয়ে কোন দিকে না তাকিয়ে দৌড়াতে হল।

এবং ঠিক তিন মিনিট বাকি থাকতে ফেরীটা ধরতে পারলাম। আমরাই কিন্তু লাস্ট প্যাসেঞ্জার ছিলাম না। আমাদের পেছনে আরও দুইজন ছিল। প্রায় সাড়ে ছয়ফুট লম্বা একজন মাঝবয়সী বোহেমিয়ান ধরণের ভদ্রলোক আর তার প্রিয় গ্রেট ডেন প্রজাতির কুকুরটা। এই কুকুরের উচ্চতা আবার অবিস্মরণীয়। আমার কুকুরভীতি আছে। নেকড়ে ভীতিও আছে। উচ্চতার কারণেই সম্ভবত একে নেকড়ে নেকড়ে লাগছিল। দ্বিগুণ ভীতির কবলে পড়ে একটু কাঠ হয়েই লাইন ধরে এগুচ্ছিলাম। তবে ব্যবহারের দিক থেকে এ বেশ নির্লিপ্ত ধরণের । লাইনের আরেকটু সামনে মিস্টার হার্জের সেই স্নোয়ির মত দেখতে আরেকটি ছোট্ট দুষ্টু কুকুর সেই তখন থেকে কেঁউ কেঁউ করেই যাচ্ছিল- করেই যাচ্ছিল! দুই কুকুরের দেখা হলে কঠিন ঝগড়া হবার নিয়ম। কিন্তু গ্রেট ডেনটা পাল্টা খেঁকিয়ে না উঠে মন ডুবিয়ে চিন্তা ভাবনা করছে দেখে মুগ্ধ হলাম।

ছবি সূত্র:
https://killerwal.com/tagestrip-nach-wyk-auf-fohr/

পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষায় থাকুন... আপডেট পেতে লাইক দিন GleeEra-র ফেসবুক পেজে