বল টেম্পারিংয়ের একাল সেকাল


দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে বল টেম্পারিংয়ে জড়িয়ে এবং তা প্রকাশ্যে স্বীকার করে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। যার জেরে টেস্টের মাঝ পথেই অধিনায়কত্ব ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন স্টিভ স্মিথ। সহঅধিনায়কের পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে ডেভিড ওয়ার্নারকেও। বল টেম্পারিং ক্রিকেটে অনেকটা 'ওপেন সিক্রেট' ব্যাপার। যুগে যুগে এই অবৈধ কাজ করেছেন ক্রিকেটাররা। করেও যাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে যে করবেন, সে নিশ্চয়তাও দেয়া যায়!

কিন্তু ক্যামেরন ব্যানক্রফটকে দিয়ে স্টিভ স্মিথ- ডেভিড ওয়ার্নার যেভাবে টেম্পারিং চেষ্টা করলেন এবং টিভি ক্যামেরায় ধরা খেয়ে যাওয়ার পর স্বীকার করে নিলেন, এমন নজির খুব কম। স্বীকারোক্তি দেয়া ছাড়া অবশ্য কোনো কিছু করারও ছিলো না স্মিথদের সামনে। কারণ টিভি ক্যামেরার দৃশ্যগুলো অস্বীকার করাটা স্রেফ মুর্খতাই হতো!

বল টেম্পারিং আসলে কী?

সোজা কথায় ক্রিকেট বলের স্বাভাবিক রূপকে জোর করে বদলে ফেলাই হলো বল টেম্পারিং। সাধারণত একটি ক্রিকেট বল নতুন অবস্থায় উজ্জ্বল থাকে। এই উজ্বল বলকে দ্রুত খসখসে করে তুলতে পারলে বোলাররা কোনো কোনো কন্ডিশনে বাড়তি সুবিধা পান। তো ফিল্ডাররা নানা কায়দায় এই বলকে খসখসে করে তোলার চেষ্টা করেন। এটাই বল টেম্পারিং।

আবার উল্টোও হয়। কখনো কখনো বলের উজ্জ্বলতা, বিশেষ করে এক পাশের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতেও লিপ বাম, চুইংগাম বা এ ধরনের কিছু বলে ঘসে দিলে উজ্বলতাটা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এতে কোনো কোনো কন্ডিশনে বোলারা বাড়তি সুইং পেতে পারেন। কোনো পদার্থ দিয়ে বলকে উজ্জ্বল করে রাখার চেষ্টাও বল টেম্পারিং। ক্রিকেটে দুই ধরনের টেম্পারিংই অবৈধ এবং কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু টেম্পারিং চেষ্টা তাতে মোটেও কমেনি! 

কিভাবে করা হয়? 

বল টেম্পারিং করার নানা রকম উপায় আছে। যেহেতু কাজটা অবৈধ, সেহেতু উপায়গুলোও সব সময় প্রকাশ্যে আসে না। আবার পরিস্থিতি, হাতে থাকা সুযোগের উপর নির্ভর করেও ক্রিকেটাররা নানা রকম অদ্ভুত উপায়ে টেম্পারিং করার চেষ্টা করেন। 

যেমন বল খসখসে করার জন্য উইকেটের পর ঘসা হয়। আবার ক্রিকেট কেডসের স্পাইকে বল ঘসে দেয়ার জন্যও অনেককে অভিযুক্ত হতে দেখা গেছে। এ ছাড়া নখ দিয়ে খুঁচিয়ে, বোতলের ক্যাপ দিয়ে ঘসেও বল খসখসে করে তোলা যায়। বলের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতেও এ রকম বিভিন্ন রকম উপায় আছে। 

অস্ট্রেলিয়ার আগে কারা করেছে?

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কেপটাউন টেস্টে বল টেম্পারিং করে পুরো অস্ট্রেলিয়া দলই ধরা খেয়ে গেছে। এর আগেও বল টেম্পারিংয়ের অসংখ্য উদাহরণ আছে। এক সময় তো বলা হতো, পাকিস্তান যেখানে যে দলের বিপক্ষেই খেলুক না কেনো, বল টেম্পারিং করবেই! আসলে বল টেম্পারিংকে এক ধরনের ‘নিষিদ্ধ শিল্প’ও মনে করা হয়। আর এই ‘শিল্পে’ পাকিস্তানের পেসাররা এক সময় ছিলেন দুর্দান্ত!

বল টেম্পারিংয়ের সবচেয়ে হাস্যকর উদাহরণ হতে পারেন ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল অ্যাথারটন। ১৯৯৪ সালে লর্ডস টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বল টেম্পারিংয়ের জন্য পকেটে বালু নিয়ে খেলতে নেমেছিলেন তিনি! ধরা পড়ার পর বালুর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, তিনি বলেন যে, হাত শুকনো রাখতে পকেটে ওই বালি ভরে রেখেছেন তিনি! 

ওই ঘটনায় অ্যাথারটন ম্যাচ রেফারির কাছেও নানা মিথ্যা ও অসংলগ্ন কথা বলেন। তাতেও অবশ্য মুক্তি মিলেনি তার। সেই সময়ে তাকে দুই হাজার ইউরো জরিমানা করা হয়েছিলো। 

২০০১ সালে বল টেম্পারিংয়ের জন্য অভিযুক্ত হয়ে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ ছিলেন শচিন টেন্ডুলকার। এবারও প্রতিপক্ষ ছিলো দক্ষিণ আফ্রিকা। ওই বছর পোর্ট এলিজাবেথ টেস্টে বল টেম্পারিং করে ধরা খান শচিন। পরে তিনি ম্যাচ রেফারির কাছে বলেন যে, বলের সুইংয়ে ঘাস লেগে গিয়েছিলো। সেই ঘাস সরাতে গিয়েই নাকি ক্যামেরায় ধরা পড়েন তিনি!

এ ছাড়া ২০০৬ সালের আগস্টের ইংল্যান্ড সফরে পুরো পাকিস্তান দল টেম্পারিংয়ের জন্য অভিযুক্ত হয় এবং ওই ঘটনা নিয়ে সে সময় পুরো বিশ্বে তোলপাড় পড়ে যায়। ২০১০ সালে টেম্পারিংয়ে জড়ান ইংলিশ পেসার জেমস অ্যান্ডারসন ও স্টুয়ার্ট ব্রড। একই বছর টেম্পারিং করতে গিয়ে বলে কামড় দিয়ে বসেন শহিদ আফ্রিদি! 

গত পাঁচ বছরে দুইবার বল টেম্পারিংয়ে অভিযুক্ত ফ্যাফ ডু প্লেসি। কিন্তু কোনো বারই তিনি তা স্বীকার করেননি। এতেও অবশ্য লাভ হয়নি। একবার ম্যাচ ফির অর্ধেক এবং একবার পুরো ম্যাচ ফি জরিমানা দিতে হয় তাকে। 

অস্ট্রেলিয়া কিভাবে কী করলো? 

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সফরটা জয় দিয়েই শুরু করে অস্ট্রেলিয়া। ডারবানে প্রথম টেস্টে ১১৮ রানে জিতে তারা। কিন্তু পোর্ট এলিজাবেথের পরের টেস্টে হেরে যায় তারা। সিরিজে সমতায় ফেরার জন্য তৃতীয় টেস্টে, যেটিতে টেম্পারিং কেলেঙ্কারিতে জড়ালো অস্ট্রেলিয়া, সেটিতে জেতার বিকল্প ভাবতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। 

জয়ের জন্য এই রকম পাগলাটে হয়ে যাওয়াই তাদেরকে টেম্পারিংয়ের মতো ‘পাপে’ প্ররোচিত করে। টেম্পারিং চেষ্টার কথা স্বীকার করার পর এই যুক্তিই দিয়েছেন স্টিভ স্মিথ। 

স্মিথ বলেছেন যে, টেম্পারিং করার সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলো অস্ট্রেলিয়ার লিডারশিপ গ্রুপ। মানে দলের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটাররা। এমনিতে এই গ্রুপে পাঁচ-ছয়জন আছেন বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু দোষ স্বীকারের পর কেবল দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিনায়ক ও সহঅধিনায়কই ‘লিডারশিপ গ্রুপে’ পরিণত হন এবং তাদেরকেই দায়িত্ব ছাড়তে হলো। 

স্বীকারোক্তি দেয়ার সময় স্মিথ বলেন যে, তার অধিনায়কত্বের সময়ে এই ঘটনা আর ঘটেনি এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে না। এ সময় অধিনায়কত্ব ছাড়বেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কিন্তু খেলাধুলা বিষয়ক সরকারি সংস্থা অস্ট্রেলিয়ান স্পোর্টস কমিশন অনতিবিলম্বে স্মিথকে সরিয়ে দেয়ার জন্য ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে নির্দেশ দেয়। ফলে সরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না স্মিথের সামনে। ম্যাচ চলা অবস্থায়ই নেতৃত্বে ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। 

টেম্পারিং বন্ধ করার উপায় নেই?

এক কথায় উত্তর হলো— না। টেম্পারিং ব্যাপারটা চলে আসে যুগ যুগ ধরে এবং ভবিষ্যতেও যে চলবে, সেটাও ঝুঁকি না নিয়ে বলে দেয়া যায়। কারণ টেম্পারিং ব্যাপারটা একেবারে সুনির্দিষ্ট কিছু নয়। প্রক্রিয়াগুলোও ভিন্ন ভিন্ন। খেলোয়াড়রা অনেক সময় একদম নতুন উপায়ে টেম্পারিং করে বসেন। যা দেখে টেম্পারিংয়ের ধারণাও করা যায় না। অনেক জানাই যায় না যে টেম্পারিং হয়েছে! যে বিষয়টি এ রকম অস্পষ্ট, তা বন্ধ করার আসলে উপায়ও নেই। কেবল খেলার প্রতি শতভাগ সততাই এই অবৈধ ব্যাপার বন্ধ করতে পারে।