আগুন কী?


সহজ একটা প্রশ্ন। কিন্তু উত্তরটা দিতে যেতেই থমকে যাওয়ার কথা। 
আগুন জিনিসটা কী?
পদার্থ? মৌল? যৌগ? নাকি শক্তি?
প্রাচীন মানুষের ধারণা ছিলো মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদান চারটিঃ বাতাস, পানি, মাটি, আগুন।
এর মধ্যে বাতাস আর মাটি মিশ্র পদার্থ, পানি যৌগ কিন্তু আগুন?
ভাবতে ভাবতে চলুন আমরা আগুন কিভাবে এলো সে সম্পর্কে কিছু মিথ জেনে নেই। 

পৃথিবীর অসংখ্য ধর্ম বিশ্বাসে অগ্নি দেবতা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। তবে আগুন কিভাবে এলো বা উৎপত্তি কোত্থেকে এ নিয়ে অমিলটাই বেশি। কোনো কোনো মিথ অনুসারে আগুন আর পানি সৃষ্টি জগতের আগে থেকেই ছিলো, কোথাও বলা হয়েছে যে আগুন দেবতাদের আশির্বাদ, কোথাও বা দেখানো হয়েছে যে কোনো অসীম সাহসী বীর সেটা চুরি করে এনেছে।

প্রথমে আগুন নিয়ে গ্রিক মিথোলজির কথা বলা যাক। অনেকেই কম বেশি জানেন মিথটা। গ্রীকদের প্রধান দেবতা জিউস, তার দুই ছেলে প্রমিথিউস আর এপিমেথিউসকে মানুষ আর পশু পাখি সৃষ্টির নির্দেশ দেন। আরও বলেন সৃষ্টির পর এদেরকে যেনো কোনো পুরষ্কার দেওয়া হয়। প্রমিথিউস মানুষ সৃষ্টির দায়িত্ব নেয়। সে দেবতাদের অবয়বে মানুষ তৈরি করে। বানানো শেষে সে তার ভাই এপিমেথিউসের সাথে পরমর্শ করতে যায় যে মানুষকে কি পুরষ্কার দেওয়া যায় কিন্তু এপিমেথিউস বলে যে, উপহার যা ছিলো সে তার সবই বিলিয়ে দিয়ে ফেলেছে।

এই সমস্যার সমাধানে প্রমিথিউস ঠিক করে যে সে মানুষকে আগুন উপহার দেবে, যদিও শুধুমাত্র দেবতাদেরই অধিকার ছিলো আগুনে। প্রমিথিউস সূর্য উড্ডয়নকালে সূর্য দেবতার কাছ থেকে কিছু আগুন চেয়ে নেয় তারপর মানুষকে আগুনের ব্যবহার শিখিয়ে দেয়।

আর একটা বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, মানুষকে দেওয়ার মতো কোনো পুরষ্কার না পেয়ে প্রমিথিউস জিউসকে জিজ্ঞেস করে যে, মানুষকে পবিত্র আগুন উপহার দিতে পারবে কিনা। জিউস রাজি না হওয়ায় প্রমিথিউস শাস্তির ভয় উপেক্ষা করে, জিউসের ঘরের উনান থেকে আগুন চুরি করে মানুষকে নিয়ে দেয়। 

এটা ছিলো তার পক্ষ থেকে মর্ত্যবাসীদের জন্যে উপহার যাতে দীর্ঘ ঠাণ্ডা রাতগুলোয় তাদেরকে কাঁপতে না হয়।

চেরকি কিংবদন্তিতে বলা হয়েছে যে শুরুতে পৃথিবীতে কোনো আলো ছিলো না। ফলে পশু পাখিরা অন্ধকারে একে অন্যের সাথে শুধু ঢুশ খেতো। তখন সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয় যে অপসাম (এক ধরণের বৃক্ষবাসী প্রাণী) যাবে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, যেখানে আলো আছে। অপসাম যেতে যেতে একসময় খুঁজে পায় সূর্যকে, তখন সে দ্রুত সূর্যের একটা টুকরো চুরি করে নিজের লোমশ লেজের নীচে লুকিয়ে রাখে, তারপর চোখ বন্ধ করে দেয় ভোঁ দৌড়। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না, লেজ পুড়ে ছাই তো হয়ই, ধরাও পড়ে যায় সে। পৃথিবীর ঐ প্রান্তের লোকেরা তাদের চুরি করা জিনিস ফিরিয়ে নিয়ে নেয়। 

এবার তাই বাজপাখিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় আগুন চুরি করার। সে সূর্যের কাছে পৌঁছে একটা টুকরো চুরি করে নিজের মাথার উপরে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু তাতে তার মাথার চামড়া পুড়ে যায় আর ব্যাথার চোটে সে টুকরোটা ফেলে দেয়। 

সর্বশেষে একটা মাকড়শা সফলভাবে চুরি করে আনে আগুন। সে একটা কাদার পাত্রে আগুন লুকিয়ে নিজের জালের সুতো ধরে ফিরে আসে নিজের ডেরায়।

প্রাচীন আরো অনেকগুলো গল্পকথায় আগুন চোর হিসেবে খরগোশ, কাক, বীভার, কুকুর, বেজির উল্লেখ পাওয়া যায়। ন্যাটিভ আমেরিকান্দের ধারণা মতে, এক পিশাচ আগুনকে লুকিয়ে রেখেছিলো, যাতে মানুষ এর থেকে উপকৃত হতে না পারে। অগ্নিপর্বত নামের এক জায়গায় সেটাকে কড়া পাহারায় রেখে দেওয়া হয়। কিন্তু এক কয়োটি পাহারাদারদের ধোকা দিয়ে আগুন নিয়ে পালিয়ে আসে এবং মানুষকে দিয়ে দেয়।

তবে আমাজন নদীর অববাহিকায় যে ইন্ডিয়ানরা বাস করে তাদের বিশ্বাস একটু ভিন্ন। এখানে কোনো পশু না, মানুষই আগুনের ব্যবস্থা করে। এক ছোট ছেলেকে একটা জাগুয়ার ধরে নিজের গুহায় নিয়ে যায়। সেখানে ছেলেটা দেখতে পায় যে জাগুয়ারটা আগুনে নিজের খাবার রান্না করছে। সে ওখান থেকে একটা জ্বলন্ত কয়লা নিয়ে নিজের এলাকায় পালিয়ে আসে। তখন তারাও রান্না শিখে যায়।

আফ্রিকার বুশম্যানেরা বিশ্বাস করে যে শুরুতে মানুষ আর পশু পাখি সবাই বাস করতো পাতালে। সেখানে তাদের সাথে থাকতো সকল জীবের প্রভু, কাং। সে ছিলো এক স্বর্গীয় সময়। কাং মাটির উপরেও প্রাণ সৃষ্টির পরিকল্পনা করা শুরু করেন। তিনি একটা বিশাল গাছ সৃষ্টি করেন, সেটার শাখা প্রশাখা সমস্ত দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর তিনি সকল মানুষ আর পশুদেরকে উপরে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তাদেরকে আগুন জ্বালানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি, কারণ তাতে অশুভ কিছু একটা ঘটবে।

রাত নেমে আসতেই ঠাণ্ডার চোটে সবাই বাধ্য হলো আগুন জ্বালতে, কিন্তু পশুরা ভয় পেয়ে গুহা অথবা পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেলো। কাং যে অশুভ ঘটনার কথা বলেছিলেন সেটা সত্যি হলো। কারণ সেই থেকে মানুষ আর পশুরা আর কখনোই একসাথে থাকতে পারেনি।

আগুন সংক্রান্ত সবচে বিখ্যাত পৌরণিক প্রাণী হচ্ছে ড্রাগন। সবাই জানি যে ড্রাগন আগুনের নিঃশ্বাস ছাড়তে পারে। 

ব্যাবিলনিয়ান একটা মিথে আছে যে তিয়ামাত নামের একজন নিজেকে ড্রাগনে রূপান্তরিত করে। পরবর্তিতে সে এক লড়াইতে পরাজিত হয় নিজেকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলে। এক ভাগ থেকে তৈরি হয় পৃথিবী, আর একভাগ থেকে আকাশ। 

নর্স মিথ অনুযায়ী এক ড্রাগন পৃথিবী বেস্টন করে রাখা একটা গাছের শিকড় খেয়ে মানুষের থাকার জায়গা করে দেয়। এর বাইরে রোমান, গ্রিক, সেল্টিক এবং চাইনিজ মিথ-এ তো ড্রাগনের উল্লেখ আছেই।

প্রাচীন কালের মতো এখনো অনেক জায়গায় অগ্নি উৎসব দেখা যায়। আগুন সব কিছুকে শুচি করে দেয়। সেই সাথে এটা হচ্ছে পুনরুজ্জীবনের প্রতীক

তাহলে আগুন কি?

যাই হোক, আমরা ফিরে আসি আমাদের একটু আগের জ্বলন্ত প্রশ্নটায়। আশা করি উত্তর বের করে ফেলেছেন। তাহলে আসুন মিলিয়ে নেই। আর না পারলে জেনেন নেই।
আগুন কোনো পদার্থ নয়। আগুন হলো ‘দহন’ (Combustion) বিক্রিয়ার দৃশ্যমান রূপ।

দহনের প্রক্রিয়া

বইয়ের ভাষায় কোনো মৌল বা যৌগকে বায়ুর অক্সিজেনের উপস্থিতিতে পুড়িয়ে তার উপাদান মৌলের অক্সাইডে পরিনত করার প্রক্রিয়াকে দহন বিক্রিয়া বলে ।

দহন বিক্রিয়ায় তিনটি জিনিস লাগে- অক্সিজেন, জ্বালানি এবং পর্যাপ্ত তাপ। এই তিনটি জিনিস যতোক্ষণ থাকে ততোক্ষণ আগুন জ্বলতে থাকে।

দহন হয় শুধুমাত্র হয় গ্যাসের সাথে গ্যাসের বিক্রিয়ায়। কিন্তু মাত্রই বলা হলো যে, দহন মানে হচ্ছে যখন অক্সিজেনের সাথে জ্বালানির বিক্রিয়া। আর জ্বালানি- কঠিন, তরল, বায়বীয় সবই হতে পারে। তাহলে?

আসলে দহনের ক্ষেত্রে কঠিন বা তরল জ্বালানিকে এতো তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয় যে পদার্থটা তার পৃষ্ঠ থেকে গ্যাস নিঃসরণ করতে শুরু করে।

তখন গ্যাসের অণুগুলো ভেঙে যায় আর ভাঙা অংশের একটা অংশ বাতাসের অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে নতুন কোনো যৌগ তৈরি করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পানি আর কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়। 

যেমন ধরুন, কাগজে আগুন ধরে কিভাবে? কাগজের কাছে আগুন আনলে, আগুনের প্রভাবে কাগজের অনুগুলো ছোটাছুটি শুরু করে আর পরস্পর থেকে দূরে সরে গিয়ে গ্যাসে পরিণত হয়। তখন গ্যাসের অণু অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া শুরু করে আর কাগজের দহন শুরু হয়।

আগুন দেখা যায় কেনো?

মাত্রই আমরা জানলাম যে দহনের সময় গ্যাসের অণু ভেঙে যায়। এই অণুগুলো যখন ভাঙ্গে তখন তাপ শক্তি বিকিরণ বা শোষণ হয়। তাপশক্তি সীমিত পরিসরে এক ধরণের গতি শক্তি। রিচার্ড ফাইনম্যানের মতে, তাপ হচ্ছে ‘পরমাণুর ঝাঁকি।’ তো এই ঝাকাঝাকির ফলে তৈরি হয় তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ অর্থাৎ আলো। আর আমরা আগুন দেখতে পাই।

টীকাঃ

  • কোনো কিছুর সম্পূর্ণ দহন হলে আগুনে ধোয়া হয় না। না হলে ধোয়া হয়।
  • আগুনের শিখার আকৃতি নির্ভর করে মধ্যাকর্ষের উপর। পৃথিবীতে আগুনের শিখা লম্বা হলেও মহাকাশের কোনো স্পেস শাটলে সেটা হবে গোলকের মতো।