জুম্মি নাহদিয়ার একগুচ্ছ গল্প


বনবাস

অচেনা অজানা বনের এক প্রান্তে আমি পেতেছিলাম আমার সংসার। 
ঠিক খড়কুটো দিয়ে না হলেও কাছাকাছি সিস্টেমে রান্না করেছি ।
বাইসন পুড়িয়ে খাইনি ঠিক আছে, কিন্তু ফার্মের মুরগী পোড়া তো খেয়েছি ! 
কালো রঙের রাত্তির বেলা আকাশের চাঁদ দেখেছি একা একা । ভুতের ভয়ে এক দৌড়ে টাঙ্গানো তাবুর ভেতর ঢুকে না পড়লেও আকোড়ায় তো ঢুকেছি!

সারাদিন কেটে যেত বনের এলোপথ ধরে হেঁটে। বড্ড বেশী উদ্দেশ্যহীন ছিল সেই হাঁটা। ফেরার পথ খুঁজে পেতে হ্যান্সেলের নুড়ি ফেলে চিহ্ন রাখার মত আমি কিছু চিহ্ন রেখে দিতাম । একটা ইশটিশন, একটা গোরস্তান, একটা ছোট খাটো বাজার, কিছু সুন্দর সুন্দর একতালা বাসা।
হ্যা, আমার বনে বাজারও বসে, মাছ- মুরগীর বেচাকেনা হয়।

প্রায় দুপুরেই কিছু শস্য, কিছু সবজী তুলে রাঁধতে বসতাম । আকোড়ার ঘরের মত ছোট্ট আবদ্ধ জায়গায় মশলা দিয়ে রান্নাবাটি করলে আশেপাশের প্রানীকূল ভাববে এই মেয়ে নিশ্চয়ই ইন্ডিয়ান, মিস্ট্রেস অব দ্য স্পাইস। কিন্তু আমি তো সেটা না, সে জন্য চড়ুইভাতি নিয়মে রাঁধতাম, কারণ চড়ুইভাতিতে মশলার তেমন অস্তিত্ব থাকাটা জরুরী কিছু না।

রান্না শেষে আবার বেড়িয়ে পড়েছি। আমার একটা আত্মীয় গাছ ছিল। একটা গাছের নীচে বসলে যতটুকু প্রশ্রয় পাওয়া সম্ভব, আমি সেই গাছ থেকে পেয়েছি । একমনে বই আগা গোঁড়া শেষ করেছি। আলো বাতাসের ঠিক ঠাক আর পোকা টোকাও কামড়ায় নাই। শীতের বিকেল ফুঁস করে উড়ে চলে গেলে আমি চলে যেতাম অনেক পুরনো ওই ইশটিশনটার কাছে। খুব বেশী ট্রেনের আসা যাওয়া হয়না। অনেক্ষন, অনেক্ষন পর পর প্রায় শেকড় গজিয়ে ওঠা আমাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ক্ষিপ্র গতির অহংকারে ছুটে চলে যেত একটা একটা ট্রেন।

আকাশে তখন চাঁদ উঠত। চাঁদের চেহারায় ক্ষয়া ভাব প্রবল হলে মাঝে মধ্যে গা শিউড়ে উঠলে ঐযে বললাম, ফিরে গিয়েছি আকোড়ায়। নাইলে আরও কিছুক্ষন অপেক্ষা করি চশমা পরা একজনের জন্য। তার একটু পরে ট্রেনের একটা নির্দিষ্ট বগি থেকে লাফ দিয়ে নামার কথা। নেমেই বিস্মিত চেহারায় বলার কথা, “এত রাতে এইখানে কি?”

স্থায়ীভাবে সংসার করতে চলে আসার পরপরই ওর প্রায় তিনমাস টেলিকমের কি একটা কাজে বনে থাকতে হয়েছে। আমরা শুক্রবার রাতে হামবুর্গ চলে আসতাম আবার রবিবার বিকেলে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ট্রেন ধরে চলে যেতাম বনে। কোন কোন সময় মাঝের কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আটবার ট্রেন পরিবর্তনের অ্যাডভেঞ্চার করেছি। আবার মিটফারে গিয়েছি কোলোন পর্যন্ত। রাতের আলোয় কোলোনকে হালকা চিনে নিয়ে আবার ছুটেছি বনের সেন্ট্রাল ষ্টেশনে। হোটেল আকোড়ার দোতালাতে এবং ওই একটা ঘরেই আমরা রবিবার মধ্যরাতে লাগেজ নিয়ে ঢুকতাম ।

কি জানি, কিছুটা জংলা যাযাবর আর চড়ুই ভাতি টাইপ সংসার করেছিলাম বলেই বন শহরটার প্রতি আমার কেমন জানি মায়া। জানুয়ারী ফেব্রুয়ারী মাসে সেই মায়া আনুপাতিক হারে বাড়ে।


“এই একলা ঘর আমার দেশ”

আকোড়ার স্টুডিও ঘরটায় ছোট্ট একটা বারান্দা ছিল আমার দোতলায়। সে বছর শীতও পড়েছিল খুব। বারান্দায় দাঁড়ালে সামনের শীতগ্রস্ত বাগান ছাড়িয়ে আরও অনেক মরা পাতার বাগান, ইয়োরোপের বনেদী মেয়েরা একসময় যেমন সম্ভ্রান্ত বনেট চুলে জড়িয়ে রাখতো- তেমন তুষারের ঘেরাটোপে কৃষ্ণবর্ণা কত গাছ! গাছেদের শরীরেও বনেটের সাথে যেন মিলিয়ে পরা লেসের গাউন।

একটু দূরের নীচতলার ছোট্ট বাগানে রাখা ছিল একটা কিশোর কিশোর সাইকেল। সাইকেলের অধিকারী আসলে কোন কিশোর কিনা জানিনা। এক তরুণীকে দেখতাম দুপুরবেলা ধোঁয়ার রিং বানিয়ে শীতল বাতাসে ছেড়ে দিচ্ছে। পাশের একটা পুশচেয়ার মাঝে মাঝে দুলে উঠত। নবজাতকের কান্না শোনা যেত। পরিষ্কার বাতাসে দিবানিদ্রা করতে এসে শিশুটি নিকোটিনের বিষ নিয়ে ফেলল কিনা এটা নিয়ে মায়ের চাইতে মাসী না হয়েও আমার কেন যেন দরদ বেশী লাগত।

অনেকগুলো বারান্দা দেখা যেত আমার বারান্দা থেকে। একটি বারান্দায় প্রায় সকালবেলাতেই একলা চেয়ার পেতে চা খেতেন একজন শেষ বয়সের নারী। উনি কাকে দেখতেন জানিনা, আমি তাকে দেখতাম। কোথাও রেখে আসা সময়টাকে তীব্রভাবে অনুভবের চেষ্টা করতাম।

ফাঁকা রাস্তাটায় কিছু টুং টাং হেলুসিনেশনে মগ্ন হবার সময় একটা ফক্স ওয়াগনের তীব্র হর্ন বলে দিল, এটা একটা গভীর দিন। তখন অলিতে গলিতে রিক্সারা দল বেঁধে দূরে কোথায় চলে গেল! তাদের এভাবে চলে যাওয়াটা লিরিসিস্টের সেই “অগভীর সিনেমার নাটুকে বিদায়” এর মত সুঁই বিঁধিয়ে দিয়ে যায়।

আমার রেখে আসা তরঙ্গের জানালা! হুড ফেলা সারা ঢাকা শহর রিক্সা! আমার স্বদেশ! আমায় পাল্টে যেতে হবে। আমি তোমাদের একদম ভাবছিনা! কাঁদছি তো নাইই।

অভিমান পর্বের চূড়ান্ত মুহূর্তে দরজায় কড়া নেড়েছে কেউ। পিপহোলে দেখি মারিওন দাঁড়িয়ে আছে। মারিওন রুম সার্ভিসের কর্মী। স্টুডিও রুমটা ঝেড়ে মুছে, বিছানাপত্তর বদলে দিতে এসেছে। আমি আমার জার্মান লেভেল এ ওয়ান জ্ঞান দিয়ে এই হাস্যমুখী মানুষটার সাথে টুকটাক বার্তা আদান প্রদান করতাম। মারিওনের চুলের ডিজাইন কিছুটা রুশ প্রজাতন্ত্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের মত। খেয়াল করে দেখলে নাক চোখেও যুবক বয়সের প্রেসিডেন্টের আদল শুধু কী আমিই পাই কিনা কে জানে। সে কারণে মারিওনকে ইয়েলৎসিন সাহেবের মেলায় হারিয়ে যাওয়া বোন মনে হলেও বিষয়টা আসলে ভ্রম। বাস্তব জীবনে ভদ্রমহিলা আজন্ম একজন বন সিভিলিয়ান।

পঁয়তাল্লিশের মারিওন ঘরটায় দ্রুত হাতে কাজ করতে করতে মাঝে মধ্যে বিশ্রাম নিত মিনিট পাঁচেকের জন্য। তখন আমাকে টেবিল একটা ছেলে, রাস্তা একটা মেয়ে, গাড়ি একটা ছেলে মেয়ে কেউনা- নিরপেক্ষ হলে সম্প্রদান কারক- দ্বিতীয়া বিভক্তি কি বসবে টসবে এইসমস্ত শেখাতো। আমার বনের একমাত্র ভাষা শিক্ষক হড়বড় করে আবার গল্পও শোনাতো। মধ্যিখানে হঠাৎ কি ভেবে জিজ্ঞেস করত, “ফ্যারটেস্ট ডু?”

মাথা নেড়ে বোঝানোর চেষ্টা করতাম যে এরকম দ্রুত, গলি ঘুপচিওয়ালা জার্মানে কথা বললে সব কথা কিরকম করে বুঝতে পারবো?

তারপর হাত নেড়ে ধীরে ধীরে বলেছে, আমি তখন বুঝতে পেরেছি দূরের পাহাড়গুলো কেমন জাদু জানে আর রাইনকে লোকে ভালবেসে একটা রোম্যান্টিক নদী বলে।

খুব শাদা বিছানার ঢাকনার ওপর তোয়ালেদের রাজহংস আমি চাই কিনা জানতে চায়। এই রাজহংসের সাঁতার কাটা মৌসুম এখন না হলেও আমি ভাল শ্রোতা, তাই চাইলে আমি তাদের পেতে পারি এই অবেলায়। জানালাম, চাইনা আমি। তবে তোমার হৃদয়টা সুন্দর। ধন্যবাদ।

দরজা চাপিয়ে দিয়ে ভিনদেশী পাখির মত শিষ ফুঁকতে ফুঁকতে চলে যায় মারিওন। তারপর আমি রাস্তা দেখি। রাস্তার ভেতর রাস্তা ভেবে নেয়া আমার পুরনো অভ্যেস। ওয়েস্টপ্রয়েযেনস্ট্রাসেকে তাজমহল রোড বানিয়ে দেখার সময় এলাকার পুরনো ঘ্রাণ নিতে ভাল লেগেছে। নতুন ঘরবাড়িগুলো খুব নিপাট। শুন্য আঙিনাগুলোতে যখন বসন্ত আসে, দুকূল ছাপিয়ে আসে বোঝা যায়। এখন কিছু পাতলা টিনের শরীরে রঙিন ফুল- প্রজাপতি এখানে সেখানে মুখ গুঁজে আছে। বসন্ত এলেই সত্যিকারের ফুলেদের হাত ধরবে তারা।

হঠাৎ আকাশ থেকে অযুত নিযুত তুষার কণারা বারান্দায় নেমে এল। তুষারবিদ্ধ হতে হতে নিজেকে খোঁজার আচ্ছন্নতা বড় খারাপ।


বদ্যিবাড়ি আর ভাতের গল্প

ইমার্জেন্সি এ্যাম্বুলেন্সের হুলুস্থুল, প্যাঁ পোর ভেতর শুয়ে থাকার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। মানুষের হুড়োহুড়ি দেখতে ভাল লাগছিল না। তুষারমগ্ন বন দেখতেও না। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে যেতে ভাবছিলাম, বনে এসে এভাবে বদ্যিখানার পাথরের মাতা মেরী, ডাক্তারদের চিন্তিত চেহারা দেখা লাগবে কে জানত। কোথায় ঘাপটি মেরে ছিল অসুখ, এই নগরীতে হুট করে শক্তি দেখিয়ে গেল।

করিডোরে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মানুষটাকে রেখে আসতে এই অদ্ভুত দিনেও নির্মম ভাল লেগেছে। ছোটবেলা সত্যিকারের জ্বর এলে আম্মুর শুকনো চেহারা দেখতে যেমন লাগতো। কিছু করার নেই। তেইশে এসেও বারো তেরোতে আটকে থাকার ব্যপারটাই তো নির্মম!

তিন ঘণ্টা পর স্ট্রেচারে শুয়ে শুয়ে কেবিনে যাবার সময় মনে হচ্ছিল সম্ভবত মারা যাচ্ছি। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ভাত তরকারী না খেতে পেলে মরে ঠিক ভূত হয়ে যাচ্ছি। দেশের ভাত তরকারীর ওপর এইরকমের বুভুক্ষ লালচ অতীতে বা ভবিষ্যতে সেভাবে টের পাইনি। বরং পরবর্তীতে বৈদেশের এই সেই হাসপাতাল অভিজ্ঞতাগুলোতে সসে ডোবানো মাছ, সব্জি বেশ মুখরোচক লেগেছে আমার।

দেশী ঠাণ্ডা তরকারী দিয়ে মোটা চালের ভাত খাওয়ার বিষয়টাতে খিদের চেয়ে তৃষ্ণার উপস্থিতি মনে হয় বেশী ছিল। খেতে না পাওয়া মানুষের কষ্ট আরও প্রবলভাবে উপলব্ধি করলাম। তবে আল্লাহ তায়ালা অত বড় পরীক্ষায় ফেলেননি। ভর দুপুরে হটপট ভরতি বাংলা খাবার দিয়ে বন্যা ভাবীকে পাঠিয়ে দিলেন। বন্যা ভাবী দেখি দূরে ওয়েটিং রুমে দাঁড়িয়ে আমাকে হাসিমুখে হাত নাড়ছেন। আমি কৃতজ্ঞ চোখে ওনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেই ভাষা উনি পড়তে পেরেছিলেন কিনা জানিনা।

বিকেল বেলা আরেকজন ভাবী এলেন রাতের খাবার নিয়ে। তার প্রতিও কৃতজ্ঞতা থাকবে। পরভূমিতে সদ্য আসা একজন হাভাতে বাঙালিকে সঙ্কট থেকে উদ্ধার করা সামান্য কোন ঘটনা নয়। সারাজীবন মনে রাখার মত ঘটনা।


অসুখের পরে একগুচ্ছ বন

হাসপাতাল থেকে ছুটি পাবার পরের পৃথিবী আর আগের পৃথিবীর ভেতর কিছু ফারাক থাকেই। হোক সেটা তিনরাত ক্যানোলা আর স্যালাইনের নল লাগিয়ে কাষ্ঠখণ্ড হয়ে শুয়ে থাকা অথবা মাসের পর মাস। উপলব্ধির তীব্রতায় হেরফের হয় এইটুকুই। অসুখের পরে বরফের ওপর রোদের ঝিলিক পড়েছে তো ঘনঘোর ফেব্রুয়ারীতে যেন বসন্ত এসে পড়েছে।

আকোড়া থেকে ট্রেন ষ্টেশন খুব কাছে। বাসগুলোকে পেতেও দূরে যেতে হয়না। সপ্তাহের টিকেট ব্যাগপ্যাকে থাকায় ট্রেনে চেপে হয়ত চলে গিয়েছি সিটি সেন্টার, মার্কেট স্কয়ার বা ওল্ড সিটি হলের কাছে। ট্রেনের ভেতর কত রকমের মলাট, বইয়ের পাতা দেখলাম! ধূসর গোলাপের বুকে ছুরি বসিয়েছে মারদাঙ্গা খুনে প্রেম, কালো আলখাল্লা জড়িয়েছে একাকী আততায়ী, কাউবয় লাকি ল্যুক চুরুট মুখে নিয়ে বসে দাবা খেলছে অথবা কেবলই অক্ষরের পর সাজানো অক্ষর। কিন্ডলে, ট্যাবেও পড়ছে মানুষ। বাসের ভেতরেও তাই। আবার জানালার ওপাশে শীতের হুংকারের ভেতরেই নির্ভীক জনতা এমনভাবে সাইকেলে চেপে উড়ে চলে যায় যেন এই হুংকারকে তারা থোড়াই কেয়ার করে।

পুরো বন শহরে সাড়ে তিন লাখ মানুষের বসবাস। এর ভেতর শতকরা ১৪ জনই বিদেশী। সে কারণে একটু পর পর আদর্শ বনাঞ্চলের মানুষের পাশাপাশি ভিন্ন গড়নের- পোশাকের মানুষেরা চোখে চোখ পড়লে হাসিমুখে “হালো” বলেছে, জিলবাবের আবরণ থেকে “সালামুন আলেইকুম শোয়েস্তা ( শোয়েস্তা মানে বোন)” দিয়েছে। দেশের বাইরে পা রাখার পর ভিনদেশীদের এই ভয় তাড়ুয়া অভ্যর্থনার অভ্যাস, অন্যের দেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার ব্যপারে বেশ কার্যকর। অথচ আমাদের দেশে ঠিক উল্টো চিত্রই পাওয়া যায়। রিক্সায় বসা ঘোর কৃষ্ণবর্ণের বিদেশীদের দেখে পাড়ার ফচকে ছেলেদের সোল্লাশে “মাইনষে বলে তারে কালা রে কালা” গেয়ে উঠে হুটোপুটি খাওয়ার দৃশ্যটি দেখেছি যখন, অত্যন্ত অপ্রীতিকর এবং অসম্মানজনক লাগলেও উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টা অস্বাভাবিক না। আবার কাঙ্ক্ষিত শাদাচামড়ার মেম দেখলে হিন্দী চটুল গোরি গোরি মার্কা গানের বাইরেও যে একটা ভাবনা আছে, একটা আত্মমর্যাদার জায়গা আছে সেটা তাদের কিভাবে কে বোঝাবে?

সিটি সেন্টারে পুরনো দিনের ঘরবাড়ি বা দপ্তরের আদিমতা বজায় রেখে সংস্করণের বিষয়টা ভাল লেগেছে বেশ। বেশ প্রাচীন চার্চ আর সুরের খেলোয়াড় (সুর নিয়ে খেলে যে সেই তো খেলোয়াড়) লুদভেক বিটোফেনের নমুনা দেখলাম। খ্যাপা চোখের বিটোফেনের সুরেলা কাঠের বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়েছি দু একদিন। তবে সিটি সেন্টারের একটা বইয়ের দোকানে বসে বই পড়ার ব্যবস্থা ছিল। এই দোকানের অসংখ্য শাখা পুরো জার্মানিতেই ছড়িয়ে আছে। দোকানের নাম থালিয়া। ক্যালোরি বিষয়ক বোধোদয় মাঝে মধ্যে উপচে পড়ত তাই মনে আছে ব্ল্যাক কফি সামনে নিয়ে থালিয়াতে টুকটাক পড়তাম। দু এক কলম লিখতামও।

বন শহরে দেখার মত আলবৎ কত কিছু আছে! একে তো একসময়ের রাজধানী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চার বছর পর থেকে মধ্যমণি হয়ে অনেকগুলো বছর আলো ছড়িয়েছিল। বার্লিন প্রাচীর পতনের এক বছরের ভেতর বন তার কর্তৃত্ব বার্লিনের হাতে তুলে দেয়। সংসদ, বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তর, কূটনৈতিকদের বাসস্থান স্থানান্তরীত হয়ে ওদিকে চলে যায়। বনবাসীদের এই নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। কারো জন্য এটা কাজের জটিলতা বাড়িয়েছে। আগে ঘর হইতে দুই পা হাঁটিলেই জরুরী প্রতিষ্ঠানগুলোর সদর দপ্তর পাওয়া যেত। এখন পা বাড়িয়ে সেই বার্লিনে নিতে হয়। অন্য পক্ষের কাছে আবার কোলাহল আর ঝুটঝামেলাবিহীন বনের গুরুত্বই বেশী।

পুরনো সংসদভবনটি এখন জাতিসংঘের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জার্মানির বিবিসি/ সিএনএন হল ডয়েচে ভেলে, এই ডয়েচে ভেলের সদর দপ্তরও বনে। কারো যদি সৈয়দ মুজতবা আলীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন বিশ্ববিদ্যালয় দেখে আসতে ইচ্ছে হয় তাহলে বনেই যেতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস প্রাসাদের ভেতর। রাজপরিবার থাকবে সেই উদ্দেশ্যে ইনিশিয়ালি দালানটা বানানো হয়েছিল বিধায় এরকম গুরুগম্ভীর কারুকাজ। প্রাসাদ নির্মাণের প্রায় একশ বছর পরে এটি উচ্চ শিক্ষার জন্য ছেড়ে দেয়া হয়।

বহিরাগত হিসেবে সেজেগুজে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দর্শনার্থীরা যেভাবে যায়, তেমন গিয়েছিলাম বন্যা ভাবী- ভাইয়া আর তাদের শিশুপুত্র আয়ানের সাথে। গুটগুট চার বছরের একটা বাচ্চা। জরুরী কথা ছাড়া বাড়তি কথা বলতে তেমন শুনিনি। আমাকে দরকার পড়লে মাঝে মধ্যে “অ্যাই ভাবী- অ্যাই ভাবী” ডেকেছে। মা বাবা ভাবী ডাকে, ছেলেও ভাবী ডাকে। আমার প্রথম ছেলে যেমন আমাকে মা ডাকার আগে নাম ধরে ডেকেছে। বাচ্চাদের এই সরলচিন্তায় আমার হৃদয় সব সময় দ্রবীভূতই হয়েছে।


বনের রাইন অথবা রাইনের বন 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে রাইন দেখা যায়। এই বিষয়টাও হৃদয় দ্রবীভূত হবার মতই। আমার স্কুলের আঙিনায় ছিল পুকুর। কোন কোন ক্লাসরুমের বেঞ্চে ঠেলেঠুলে জানালার পাশে বসতে পারলেই তিরতিরে পানির আনন্দ আমার মগজের জট খুলে দিতে পারত। বিস্বাদ পরিমিতির ভেতরেও তেল- লবনের আন্দাজে পরিমিতিবোধ পাওয়া যেত। দুপুরবেলার ঝিমঝিম ক্লাসেও আমি ফটিকের দুঃখ যেন বেশী বুঝতে পারতাম। ফটিক যখন আনমনে বলে উঠত, "ঐ হোথা" তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুকুরের দিকে তাকিয়েই সেই হোথাকে খুঁজেছি। বন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাইনের সাহচার্য পেয়েছে। আমার চোখে তারা বড় সুখে আছে।

বন হচ্ছে জুরিখ, কোলোন বা কোবলেনযের মত আরেকটি রাইনল্যান্ড। ইয়োরোপের যে সকল ভূমির বুক চিড়ে রাইন বয়ে গিয়েছে তারা সবাই রাইনল্যান্ড। রাইনের ধারা অত প্রশস্ত নয়। একূলে দাঁড়ালে অকূলের ঘরবাড়ি- বসতি দেখতে দূরবীনের প্রয়োজন পড়েনা। পিচ ঢালা রাস্তার ওপর হেঁটে হেঁটে বা সাইকেলে চড়ে রাইন দেখার আলাদা পথ আছে। প্রমোদতরীর ব্যবস্থাও আছে। আমরা হাঁটলাম। জুরিখের উত্তাল গ্রীষ্মে রাইন দেখেছি ক্রুজের খোলা ছাদে। এবার পায়ে হেঁটে শীতল চুপচাপ স্বভাবের রাইনকে দেখতেই বেশী ভাল লাগবে।

সুনীলের কোন একটা লেখায় পড়েছিলাম তিনি নদ-নদী জমাতেন। মিসিসিপি, নীল, রাইন, ভলগা বা আমাদের আড়িয়াল খাঁ এর মত ওনার সংগ্রহে আছে অসংখ্য জলের ধারা । উনি পৃথিবীর পথে প্রান্তরে যত তটিনী- তরঙ্গিণী দেখেছেন, একটু থেমে তাদের আঁজলা ভরা স্পর্শ নিয়েছেন। আমার অবশ্য নদী জমানোর বাতিক নেই। তবে নদীতে পা ডোবাতে পারলে ভীষণ মুগ্ধ হই। রাইনের বিশুদ্ধ পানিতে পা ডোবানোর জন্য বড় লোভ হচ্ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে জুতা মোজা খুলে কনকনে পানিতে পা চুবানোর মত পরিস্থিতি তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ায় লোভটাকেই বরং রাইনের ঠাণ্ডা পানিতে ছেড়ে দিলাম এবং একটি অপমৃত্যু ঘটালাম।

বন এবং বোয়েলস এর ভেতর ভাল যোগাযোগ করিয়ে দেয়ার জন্য দেখলাম কেনেডি সেতু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। এই সেতুর আগের নাম ছিল রাইন সেতু। নাৎসিরা এসে নাম পছন্দ করল ক্লস ক্লেমেন্স ব্রুকে। জার্মান ভাষায় ব্রুকে মানে সেতু। এরপর ইউএস প্রেসিডেন্ট কেনেডি সাহেবের গুপ্তহত্যার দশদিনের মাথায় এর নাম রাখা হল কেনেডি ব্রুকে।

শীতের রাইন গ্রীষ্মের মত এত প্রাণবন্ত ছিল না তবু এই ঠাণ্ডা মেজাজের রাইনকে ভালবাসছিলাম অল্প অল্প করে। কার্গো যাচ্ছিল কিছু, কিছু পর্যটকবাহী ছোট জাহাজ তো ছিলই। আর পানিও খুব দূষণমুক্ত।

তবে সুন্দরকে দেখতে হয় দূর থেকে। রাইন সুন্দর। পাহাড়ের সর্পিল রাস্তা ধরে চলছিল ছোট্ট রেলের গাড়ি। নাম ড্রাখেনফেলস বান। আমরা যাচ্ছি ড্রাখেনফেলসের একদম চূড়ায়, যেখানে রয়েছে সুপ্রাচীন একটি দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। ভাঙাচোরা অথচ সম্মোহনের ক্ষমতায় ক্ষমতাবান দুর্গের সামনে দাঁড়িয়ে আয়ান চকলেট জাতীয় কিছু খাচ্ছিল। ওর মা মনে হল ওকে খাদ্যদ্রব্য সেধে দেখতে বলল আমাকে। এসে মিষ্টি করে জিজ্ঞেস করলো, “ভাবী শোকোলাডে খাবা?”

সে সময় ক্যালোরি সচেতনতা দেখিয়ে আরেক সম্মোহনী শক্তি প্রিয় শোকোলাডের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলাম কিনা মনে পড়ছেনা এই মুহূর্তে। তবে ভূপৃষ্ঠ থেকে এত উঁচুতে ওঠার কারণে হয়ত শরীর হালকা লাগছিল। মনে হচ্ছিল আহা দিনগুলি বড় সুন্দর! ক্যালোরিরা বুঝি পুড়ে সব খাক হয়ে গেল!

খোলা বাতাসে দূরের রাইনের অনেকটুকু দেখার বিষয়টা রোমাঞ্চকর। পুতুলদের দেশে পুতুলদের বাড়িঘর- নৌকা। নদীটাও পুতুলদেরই। মারিওন বলেছিল নদীটা রোম্যান্টিক। অষ্টদশ শতাব্দীর রোম্যান্টিসিজম পিরিয়ডে জন্মানো ফ্রেডরিখ শ্লেগেলের মত সাহিত্যিক বা উইলিয়াম ক্লার্কসন স্ট্যানফিল্ডের মত প্রকাশভঙ্গীওয়ালা চিত্রকরদের সৃষ্টিগুলোতে রাইনের প্রকাশ তার প্রমাণই বয়ে বেড়ায়। রাইনল্যান্ডে এসে শ্লেগেলের মহতী নদীটির পাথুরে তীরের মেডিয়েভাল প্রাসাদ এবং ক্ষয়ে যাওয়া দুর্গকে নিয়ে ভাবনা ছিল এমন,

"The Rhine is here most charming. Enlivened on its course by the stirring shores, evermore through the twists of the stream, and notably garnished by the broken remains of castle on boldly overhanging cliffs, this region appears more like a painting of its own, or an international artwork made by a creative spirit, than a merely product of coincidence."

আবার অজার্মান কবি লর্ড বায়রনের রাইনের জন্য অনুভূতির কয়েকটি পঙক্তি,

"Through life to dwell delighted here; 
Nor could on earth a spot be found 
To nature and to me so dear, 
Could thy dear eyes in following mine 
Still sweeten more these banks of Rhine! "

সীমার ভেতর অসীমকে বা লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য- অনুভূতিকে খুঁজে নেয়ার অথবা এই প্রচণ্ড কল্পনাশক্তির অর্থ প্রণয়মূলক হতে পারে আবার রোমাঞ্চকরও হতে পারে। দ্বিতীয় অর্থটি আমার কাছে নিজের জন্য বেশী যথার্থ মনে হচ্ছিল।

আবার একটু কোথাও যত্ন করে তুলে রাখা সুঁইয়ের খোঁচাও বিঁধলো যেন। মেঘের ওপর আকাশ কখন ওড়ে আর নদীর ওপার পাখিই বা কবে বাসা বুনে ফেললো! কিচ্ছু জানালো না।