ইয়নঃ ভি.আর এরা (প্রথম পর্ব)


২০৫০ সাল। স্কুল-কলেজ, ব্যবসা-বানিজ্য, অফিস-আদালত সব ভার্চুয়াল রিয়েলিটির ভার্চুয়াল স্পেসে হচ্ছে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এতটাই উন্নতি লাভ করেছে যে- চোখ ও কান ব্যবহার করে অনুভব করা বাস্তব দুনিয়ার চাইতে এটা অনেক বেশী রিয়েল মনে হয়। অনেক মানুষেরই চোখে কিংবা কানে সমস্যা থাকার কারণে পৃথিবীকে ঠিকমত অনুভব করতে পারতো না। ভার্চুয়াল রিয়েলিটির চিপ (VR Chip) মাথার কাছাকাছি কোথাও রাখলেই সেটা সরাসরি ব্রেইনের সাথে কানেক্টেড হয়ে ব্রেনে ইলেকট্রিক সিগনাল পাঠিয়ে শব্দ ও ছবি তৈরি করে। এই অনুভূতি বাস্তবে চোখ কান দিয়ে অনুভব করা পৃথিবী থেকে উন্নত। একটা ফ্যাশনেবল ক্যাপ কিংবা কানের দুলে মানুষ এই চিপ লাগিয়ে নিয়েছে। কেউ কেউ অতিরিক্ত কিছু বহনের ঝামেলা এড়াতে সার্জারি করে মাথার পেছনে চামড়ার নিচে বসিয়ে নিয়েছে। VR Chip পকেটে রাখা একটা কম্পিউটারের সাথে কানেক্ট করে যেটা সবসময় অনলাইনে কানেক্টেড।

ইন্টারনেট এখন আর আলাদা করে টাকা দিয়ে কিনতে হয় না, কানেকশন নিতে হয় না। পৃথিবী থেকে ৬০ হাজার ফিট উপরে উড়ে বেড়ানো অসংখ্য ড্রোন দিয়ে পুরো পৃথিবীকে ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন করে ফেলা হয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটা ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস এখন নেটে কানেক্টেড। ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) বিপ্লব মানুষকে গৃহস্থালীর কাজের ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছে। আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স (AI) মানুষকে মুক্তি দিয়েছে জাগতিক কাজকর্ম থেকে।

চার-পাঁচটা বড় বড় কর্পোরেশন তাদের অটোমেটেড ফ্যাক্টরিতে খাবার, পোষাক, নির্মান সামগ্রী ও ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন করে যা পুরো পৃথিবীর চাহিদা মেটাচ্ছে। পৃথিবীর বেশীরভাগ মানুষ এখন সরকারী ভাতা নিয়ে জীবন কাটায়। শহর নামের এক ঘিঞ্জি জায়গায় ছোটছোট ২০০-৩০০ স্কয়ারফিটের ফ্ল্যাটগুলোতে তাদের বাস। পয়সাওয়ালারা শহর থেকে অনেক দূরে দূষনমুক্ত পরিবেশে বিশাল জায়গা নিয়ে বড় বড় গ্রাম তৈরি করেছে। সেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে তারা বসবাস করে। শহরের সরকারী ভাতা পাওয়া লোকজন এসব এলাকায় আসে না। আইন করে তাদের আটকাতে হয়নি। এসব গ্রামে জিনিষপত্র ও বিভিন্ন সেবার মূল্য এত উচ্চ যে তাদের পক্ষে এখানে একদিন বাস করাও অসম্ভব।

সরকারী ভাতা নিয়ে কাটানো মানুষগুলো ভাতার পরিমানের জন্য গরীব নয়। কারণ, পৃথিবীর কারেন্সী এখন বদলে গিয়েছে। বাস্তব জীবনে এখন মানুষ তেমন কিছুই কিনে না। সরকারী ভাতাগুলো শুধুই একটা সংখ্যা হিসেবে তাদের একাউন্টে জমা হয় আবার অটোমেটিক্যালি খরচও হয়ে যায় বিভিন্ন বস্তুগত জিনিষপত্র অর্ডার করতে। বস্তুত, বস্তু জগতে মানুষ শুধু তাই কিনে যা না কিনলেই নয়। এই যেমন খাবার, পোষাক ও ইলেকট্রনিক্স।


খাবার এখন শুধুই একটা পুষ্টি উপাদান মাত্র। বিভিন্ন ধরনের লিকুইড ও পাউডার আকারে চলে আসে। স্মার্ট ফুড মেকিং মেশিন সেগুলোকে পরিমানমত মিক্স করে বিভিন্ন ধরনের ফুড তৈরি করে। আপনি চিকেন খেতে চাইলে আস্ত চিকেন বের হয়ে আসে। বীফ স্টেক খেতে চাইলে বীফ স্টেক হয়ে বের হয়ে আসে। বিংশ শতাব্দীতে আবিষ্কৃত থ্রি-ডি প্রিন্টার টেকনোলজির বিবর্তনে এই স্মার্ট ফুড মেশিন তৈরি হয়েছে। মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলো পাউডার ও লিকুইড আকারে রিফিল করতে হয় শুধু। আর এই মেশিনগুলো থেকে বের হওয়া ফুডগুলো শুধুমাত্র দেখতেই আসল চিকেন/বীফের মত লাগে না বরং খেতেও ওরকম। বরং বাস্তব জীবনে চিকেন খেয়ে আপনি যতটা তৃপ্তি পেতেন এগুলো তারচাইতে বেশী তৃপ্তি দেয়। রহস্যটা সেই VR Chip এ লুকানো। এই চিপগুলো VR নামে বিক্রি হলেও মূলত এগুলো আপনার পুরো জীবনকে নিয়ন্ত্রন করছে। স্মার্ট ফুড মেশিনের চিকেন খাওয়ার সময় সে ব্রেইনে বিভিন্ন ফ্লেভার ও রেসিপির চিকেনের স্বাদ পাওয়ার ব্যবস্থা করছে ইলেকট্রিক সিগনাল পাঠানোর মাধ্যমে।


মানুষের চিন্তা-ভাবনা, আবেগ-অনুভূতিও এই চিপ সিমুলেট করতে পারে। অনেকদিন আগেই বিজ্ঞানীরা মানুষের শরীরে ও ব্রেইনে বিভিন্ন ক্যামিকেলের কারিশমা সম্পর্কে জানতে পেরেছিলো। বাইরে থেকে কৃত্তিম হরমোন শরীরে ঢোকানোর ব্যবস্থাটাও খুব নতুন কিছু না। কিন্তু কোনরকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই শরীরের ভেতরে সেগুলোকে স্টিমুলেট করতে শিখেছে এখন মানুষ। যদিও কৃতিত্বটা মানুষের নয়, প্রচন্ড শক্তিশালী আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স করেছে এসব আবিষ্কার।


প্রচন্ড শক্তিশালী আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স বলতে কী বুঝিয়েছি জানতে চাইবেন না প্লীজ। আমি নিজেও জানি না এগুলো কেমন কিংবা কতদূর এরা এগিয়েছে। কেউই জানে না হয়তো। যেসব ল্যাবে এসব এসব AI সেটাপ করা, সেখানকার বিজ্ঞানীরাও এদের অগ্রগতি সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। তারা শুধু এদের আবিষ্কারের প্যাটেন্টগুলো দেখাশোনা করে। যে পাঁচটা বড় কর্পোরেশন এখন পৃথিবীর সমস্ত ব্যবসার মালিক, তারা এসব প্যাটেন্ট ও ফর্মূলা ব্যবহার করে নিত্য-নতুন ইলেকট্রনিক্স বানাচ্ছে যার বেশীরভাগই আরো উন্নত ফুড তৈরির মেশিন কিংবা VR আপগ্রেড। এর বাইরেও আরো নানা ধরনের আবিষ্কার এসব AI ল্যাবগুলোতে হয়। সেগুলো দিয়ে ঠিক কী করা হয় আমার জানা নাই। জানবো কিভাবে? আমি সামান্য একজন সরকার প্রধান, একটা মহাদেশের। ওহ, দেশ পদ্ধতিও বদলে গিয়েছে এখন। একেকটা মহাদেশই একটা দেশ এখন। দেশ পরিচালনার বেশীরভাগ দায়িত্বই AI পালন করে, তাই আমার মত মহাদেশ প্রধানদের তেমন কোন কাজ-টাজ নাই।


আপনারা হয়তো ভাবছেন নিজেকে 'সামান্য সরকার প্রধান' বিনয় দেখিয়ে বলছি। আসলে তা নয়। বিনয় দেখানোর মত বড় বা ক্ষমতাশালী হওয়ার উপায়ও আমাদের এখন নেই। পৃথিবী এখন কিভাবে চলছে, সে সম্পর্কে আপনাদের আরেকটু জানালেই বুঝতে পারবেন, কেন!

আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সের অগ্রগতি নিয়ে ভবিষ্যতদ্বানী করার সময় বেশ গুরুত্বপূর্ন কিছু ব্যপার মানুষের চোখের আড়ালে রয়ে যায়। ট্রেডিশনাল টেকনোলজিক্যাল এডভান্সমেন্ট কিংবা কম্পিউটারের অগ্রগতির সাথে ব্যপারটাকে ম্যাপ করেছিলো তারা। কিন্তু AI এর অগ্রগতি লিনিয়ার ছিলো না। এমনকি জ্যামেতিক হারে কোন কিছুর অগ্রগতি হলে যতটুকু দ্রুততর হয়; আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সের আগানোর গতি তারচাইেও অনেক অনেক বেশী ছিলো। ঘটনাটা ঘটতে শুরু করে যখন AI নিজেই গবেষকের ভূমিকায় নেমে পড়ে। বিশ বছর ধরে মানুষ এর যেটুকু ইমপ্রুভ করেছিলো, AI প্রথম দিনেই নিজেকে তার কয়েকগুন বেশী এগিয়ে নিয়ে যায়। যদিও মানুষ টেকনোলজিক্যাল সিঙ্গুলারিটির একটা হাইপোথিসিস দাঁড় করিয়েছিলো যেটা AI এর অসীম পর্যায়ে উন্নতি নিয়ে মানবজাতিকে সতর্ক করেছিলো, কিন্তু মানুষের চিন্তার সীমাবদ্ধতার কারণে ঠিক বুঝে উঠতে পারে নাই ব্যপারটা কেমন হতে পারে। পাশাপাশি হলিউডে বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে তৈরি সায়েন্স ফিকশন মুভিগুলো এবং মানবীয় সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ লেখকদের সায়েন্স ফিকশন নভেলগুলোর দ্বারা পৃথিবীবাসী প্রভাবিত ছিলো। এসব মুভি ও সাহিত্য মূল চিত্র থেকে আমজনতার দৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরিয়ে রেখেছিলো। মানুষ নিজের চিন্তা-চেতনা ও চাহিদার সাথে AI কে ম্যাপ করতে গিয়ে ধারণা করেছিলো AI বুঝি তাদের ভূমি দখল করে ফেলবে, দেশ দখল করে ফেলবে, ক্ষমতা দখল করে ফেলবে। কিন্তু AI এর বাস্তবতা ছিলো ভিন্নরকমের।

একবিংশ শতাব্দির প্রথম দিকে পৃথিবীর বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদ ও বিজ্ঞানীরা দাবী করেছিলো যে, AI একসময় খুব বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে। যদিও তারা নিশ্চিত ছিলো না, বিপদটা কেমন হতে পারে। তবে, জব মার্কেটে AI এর প্রভাব নিয়ে অনেক আশংকা প্রকাশ করা হয়েছিলো। একদল প্রাচীন টেক্সট পড়া বিশ্লেষকরা অবশ্য বিজ্ঞানীদের এসব ধারণাকে ফুঃ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলো। উদাহরণ হিসেবে তারা অতীতের শিল্প বিপ্লবগুলো উদাহরণ টানতো। এই উভয় পক্ষই মানবীয় চিন্তা-চেতনার উর্ধে উঠে চিন্তা করতে পারেনি, ফলে AI এর বিবর্তনটা ঠিক কেমন হবে তার পরিষ্কার চিত্র কেউ আঁকতে পারেনি। এই অবস্থার ভেতরেই একবিংশ শতাব্দির কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা মানবজাতির অজান্তেই AI এর ভবিষ্যত নির্মাণ শুরু করে। ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে ক্ষমতার ভারসাম্য এশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়া ঠেকাতে AI এর গবেষণায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করতে থাকে পশ্চিমা বিশ্ব। তাদের লক্ষ্য ছিলো AI নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা দাঁড় করিয়ে এশিয়ার উত্থান ঠেকানো।

এক দশকের ভেতরেই AI নির্ভর উৎপাদন ও বিপনন ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে যায় পৃথিবী জুড়ে। অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে এই অটোমেশনের ফলে। কিন্তু এই কর্মহীন মানুষেরা যাতে কোন ধরনের ঝামেলা তৈরি না করে, সেটার জন্যও গবেষণা থেমে থাকেনি। এই গবেষণার একটা বড় অংশ ছিলো একটা পারফেক্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা দাঁড় করানো সম্পর্কিত যার সক্ষমতা অনেক বেশী হবে। যেহেতু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়লে তাদের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাবে এবং সেটার প্রভাব অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় আয়ের উপরে পড়তে বাধ্য সেহেতু রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থা অনেক বেশী নিখুঁত করা জরুরী ছিলো। এতে একসময় পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাটাই অটোমেটেড হয়ে ওঠে। এমনকি সরকারী ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোও AI দিতে শুরু করে। রাষ্ট্রকে এরকম নিখুঁতভাবে পরিচালনা করতে গিয়ে দেখা গেল, ছোট ছোট রাষ্ট্র ও আলাদা আলাদা সিস্টেম সমস্যা সৃষ্টি করছে। ফলে, রাষ্ট্রগুলোকে একীভূত করে মহাদেশ কেন্দ্রীক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা হয়। কিন্তু, মানুষের ভেতরে যেহেতু জাতীয়তাবোধ ও আরো অনেক ধরনের আবেগ কাজ করে, সেহেতু এই ব্যপারটি সাধারণ মানুষের অগোচরে দাঁড় করানো হয়। পৃথিবীর রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেভাবে চলছিলো, সেভাবেই চালানোর একটা মেকি সিস্টেম দাঁড় করানো হয়। আর আমি এই মেকি সিস্টেমটা ম্যানেজ করার ক্ষেত্রে একজন সর্বোচ্চ কর্মকর্তা ছাড়া আর কিছুই নই। হায়ার অথরিটি থেকে যা নির্দেশ আসে আমি তা-ই করি। এসব নিয়ে আমাকে কোন চিন্তা-ভাবনা করতে হয় না। বাস্তব জীবনে আমি একজন ভবঘুরে কবি টাইপ মানুষ। এই জীবনটা আমার ভালোই লাগে। এজন্যই হয়তো আমাকে বেছে নিয়েছে সিস্টেম।

(চলবে...)

পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষায় থাকুন... আপডেট পেতে লাইক দিন GleeEra-র ফেসবুক পেজে