মনোযোগ বাড়াতে খাদ্যাভাস


গত দুই দশকে মানুষের মনোযোগের ব্যাপ্তি চার সেকেন্ড কমেছে বলে বিজ্ঞানীরা দাবী করেছেন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যপক ব্যবহার, স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি এর পেছনে দায়ী বলে তারা মনে করেন। ২০০০ সালে মানুষের গড় মনোযোগের ব্যাপ্তি যেখানে ১২ সেকেন্ড ছিলো সেটা কমে এসে এখন ৮ সেকেন্ডে দাঁড়িয়ে। মজার ব্যপার হচ্ছে, একটা গোল্ডফিশের গড় মনোযোগের ব্যাপ্তি ৯ সেকেন্ড আর বর্তমান সময়ে মানুষের ৮ সেকেন্ড। আমাদের অবস্থা কি তাহলে একটা গোল্ডফিশের চাইতেও খারাপ দিকে যাচ্ছে?

তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। গোল্ডফিশ তাদের মনোযোগের ব্যাপ্তি বাড়ানোর জন্য কোন পদক্ষেপ নিতে পারবে না যা একজন মানুষ পারবে। কী সেই পদক্ষেপ? সেটাই আজকে আমরা জানবো।

আপনার মনোযোগ ঠিক রাখার জন্য খাদ্যাভাসের ব্যপারে সচেতন থাকাই যথেষ্ঠ। কিছু ভিটামিন আছে যেগুলো মানুষের মনোযোগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে। আপনার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় এই ভিটামিনগুলো রাখতে হবে। শুধু মনোযোগ ধরে রাখার জন্যই নয় বরং সুস্থ্য থাকার জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ন। কারণ, এই ভিটামিনগুলোর অভাবে আপনার শরীরে অটোফ্যাগি (autophagy) সিস্টেম চালু হয়ে যেতে পারে। অটোফ্যাগি হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যখন পর্যাপ্ত উপাদানের অভাবে আমাদের শরীরের কোষগুলো নিজেদের খেয়ে ফেলতে শুরু করে। ব্রেইনের জন্য নিয়মিত এই প্রক্রিয়া অনেক ক্ষতিকর হতে পারে। প্রতিদিন আমাদের খাদ্য তালিকায় যেসব ভিটামিন থাকা উচিত সেগুলোর উৎস ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে এখন আমরা জানবো।

Vitamin C | মনকে সতেজ রাখে

উৎসঃ আমলকি, পেয়ারা, আমড়া, লেবু, টমেটো ও সবুজ শাক-সব্জিতে  আপনি পর্যাপ্ত পরিমানে ভিটামিন সি পাবেন।
পরিমানঃ প্রতিদিন ৯০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি আমাদের শরীরের প্রয়োজন হয়।

ভিটামিন সি আমাদের পেশীর কার্যক্রম উন্নত করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমানে ভিটামিন সি গ্রহণ করলে ক্যান্সার, এ্যাজমাসহ আরো অনেক রকমের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমে আসে। এটা শরীরে আয়রন গ্রহণে (absorb) সাহায্য করে এবং শরীরের টিস্যু গঠনে সহায়ক প্রভাব ফেলে।

ভিটামিন সি আমাদের শরীরের সেরেটোনিন (serotonin) বৃদ্ধি করে যা এন্টিডিপ্রেসেন্ট (antidepressant) হিসেবে কাজ করে। সহজ বাংলায় আপনার ডিপ্রেসন কমাবে, মন ভালো রাখবে। গবেষকরা দেখেছেন যারা পর্যাপ্ত ভিটামিন সি গ্রহন করে, তারা তুলনামূলক বেশী সুখী হয়, হতাশায় কম আক্রান্ত হয়। তাই মনকে সতেজ রাখতে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি গ্রহন করুন। প্রতিদিন এক গ্লাস লেবুর সরবত (সম্ভব হলে চিনি ছাড়া) তো আমরা খেতেই পারি, তাই না?

Vitamin B3 | মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে

উৎসঃ সীম জাতীয় শস্য, আলু, ডিম, চীজ বা পনিরে আপনি পর্যাপ্ত ভিটামিন বি-৩ পাবেন।
পরিমানঃ প্রতিদিন ৩৫ মিলিগ্রাম

হার্ট ভালো রাখার জন্য ভিটামিন বি-৩ খুব বেশী কার্যকরী একটি উপাদান। এটি কোলোস্টোরেল নিয়ন্ত্রনে রাখতে সাহায্য করে। ক্যান্সার ও ডায়বেটিকসেও উপকারী। ডিপ্রেশন ও দুঃশ্চিন্তা প্রতিরোধে এটি কার্যকরী। আলজেইমার রোগীদের চিকিৎসায় এই উপাদানের ব্যপার হয়। কারণ, এটি মানুষের স্মৃতি শক্তি ও মনোযোগ বাড়াতে বিশেষ ভাবে কাজ করে থাকে। যাদের সবসময় হালকা মাথা ব্যথা থাকে, Vitamin B3 তাদের নিরাময় দিতে পারে।

Vitamin B6 | দ্যা ডোপামিন ট্রিগারার

উৎসঃ সয়া বীজ, তরমুজ, কলা, আভাকাডো, টুনা মাছ, গরুর মাংস ও হাঁস-মুরগীতে ভিটামিন বি-৬ রয়েছে।
পরিমানঃ প্রতিদিন ১.৩ থেকে ১.৭ মিলিগ্রাম 

কলা খুব সহজলভ্য একটি ফল যা পৃথিবীর ১৩০টির বেশী দেশে উৎপাদিত হয়। প্রতিদিন কমপক্ষে একটি বা দু'টি কলা খাওয়ার জন্য আপনাকে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ারও প্রয়োজন নেই, কারণ এটি খুব স্বস্তা একটি ফল। কলা আপনার ডোপামিন ট্রিগার করে, তাই অবশ্যই প্রতিদিনের মেনুতে কলা রাখার চেষ্টা করবেন।

কলার পাশাপাশি তরমুজ, আভাকাডো, গরুর মাংস ও হাঁস-মুরগীর মাংসে পর্যাপ্ত Vitamin B6 রয়েছে। এটিও মানুষের ডিপ্রেশন কমায়। এর অভাবে আপনার চিন্তা-শক্তি হ্রাস পেতে পারে, স্মৃতি হারানোর সমস্যা তৈরি হতে পারে। সুতরাং এই গুরুত্বপূর্ন উপাদানটির ব্যপারে সবসময় সজাগ থাকুন।

Vitamin B12 |  স্মৃতিশক্তি বর্ধক বা মেমরী এম্প্লিফায়ার

উৎসঃ দুধ, পনির, ডিম, শেলফিশ বা চিংড়ী জাতীয় মাছ, কাঁকড়া, প্রক্রিয়াজাত সয়া প্রোডাক্ট
পরিমানঃ প্রতিদিন ২.৪ থেকে ২.৮ মাইক্রোগ্রাম

আমাদের রক্ত কণিকাগুলো তৈরিতে এই ভিটামিন অনেক গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। মস্তিকের সঠিক গঠনের জন্য এই ভিটামিন জরুরী। এজন্য প্রতিদিন কমপক্ষে এক গ্লাস দুধ, একটা ডিম খাবার মেন্যুতে রাখা উচিত। বিশেষ করে শিশুদের সঠিক গঠনের জন্য এর কোন বিকল্প নেই। তবে গুড়া দুধ নয়, সরাসরি গরুর দুধ সংগ্রহের চেষ্টা করুন। ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়ার জন্য এটি অনেক কার্যকরী।

এই ভিটামিন আপনার নার্ভাস সিস্টেমকে ঠিক রাখে। এর অভাবে শরীরে সহজেই অবসাদ ও ক্লান্তি ভর করে। আপনার sense of orientation ঠিক রাখার ব্যপারেও এর জোড়ালো ভূমিকা রয়েছে। তাই এই উপাদানটি নিয়মিত গ্রহণের চেষ্টা করুন। তবে যদি আপনার পক্ষে প্রতিদিন দুধ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে যায়, তাহলে খোলসযুক্ত মাছ, কলিজা ও গরুর মাংস গ্রহণ করতে পারেন। ওতে কিছুটা হলেও Vitamin B12 এর ঘাটতি দূর হবে।

Omega 3 Fatty Acids | বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের জন্য

উৎসঃ বাদাম, ওয়েস্টার বা ঝিনুক, সামুদ্রিক মাছ, চিয়া সীড,  কালোজিরা
পরিমানঃ ২৫০ থেকে ৫০০ মিলিগ্রাম প্রতিদিন

একজন মানুষের প্রতিদিন ১০০ গ্রাম বাদাম খাওয়া উচিত। এটা সহজলভ্য। একটু সচেতন হলেই সম্ভব। প্রতিদিন বাদাম খাওয়াটা অভ্যাসে পরিনত করুন। কারণ, এতে আছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড যা আপনার দৃষ্টি শক্তি, হার্ট, ব্রেইন, লিভার ভালো রাখবে। আপনার বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের জন্য শরীরের যেটুকু সমর্থন প্রয়োজন সেটা ঠিক রাখবে। আপনার শিশুকে মেধাবী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অবশ্যই এই উপাদান সমৃদ্ধ খাবার প্রতিদিনের মেন্যুতে রাখুন।

পরিশেষে বলবো, এই অল্প কয়েকটি উপাদান ঠিকমত গ্রহণ করা খুব কঠিন কিছু না। একটু সচেতন হলেই সম্ভব। আপনার খাদ্য তালিকা পূর্ন থাকুক আপনার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানে। খাদ্য উপাদানগুলোর ব্যপারে  সজাগ থাকুন। সুস্থ থাকুন।

lucid.me অবলম্বনে, ত্রিভুজ আলম

পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষায় থাকুন... আপডেট পেতে লাইক দিন GleeEra-র ফেসবুক পেজে