অটোফ্যাগি বা স্ব-ভক্ষণ যেভাবে আপনাকে সুস্থ্য রাখে


মাঝে মাঝে না খেয়ে থাকা কি ভালো? আমরা জানি, সুস্থ্য থাকার জন্য শরীরের প্রয়োজনীয় উপদানগুলো সবসময় গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে বিজ্ঞান বলছে মাঝে মাঝে না খেয়ে থাকাও ভালো। এতে শরীরের বিভিন্ন সমস্যা নিজে থেকে সমাধান হয়ে যায়; এমনকি ক্যান্সারের মত প্রাণঘাতী রোগ থেকেও রক্ষা পায় মানব দেহ। কিভাবে হয় ব্যপারটা বুঝতে হলে আপনাকে জানতে হবে অটোফ্যাগি (Autophagy)  বা স্ব-ভক্ষণ নামের প্রক্রিয়াটি, যেটি আবিষ্কার করে ২০১৬ সালে জাপানি এক বিজ্ঞানী চিকিৎসা শাস্ত্রে নোবেল পেয়েছেন।

অটোফ্যাগি  বা স্ব-ভক্ষণ 

জীবের স্বাভাবিক জীবন প্রক্রিয়ায় শরীরকে সুস্থ রাখার পিছনে কোষের অভ্যন্তরে অটোফ্যাগি (Autophagy) বা স্ব-ভক্ষণ নামক এক প্রক্রিয়া চলে। সাম্প্রতিককালে এক জাপানীয় বিজ্ঞানীর গবেষনার মধ্যে দিয়ে জটিল মানবদেহের সুস্থতার ক্ষেত্রে এর গুরুত্বকে যুগান্তকারী আবিষ্কার বলেই গণ্য করা হয়েছে। 

এটা এমন এক স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যেখানে কোষ নিজে  পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরনের মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখে। সহজ ভাষায়, শরীরে খাদ্যে বা পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিলে অথবা বিরুপ পরিবেশে টিকে থাকতে শরীরের কোষগুলো তাদের বর্জ্যকে ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে এবং সাথে মৃতপ্রায় ও ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলোকে মেরে ফেলে সেখানে নতুন কোষের গঠন করে।

এই  কোষের অভ্যন্তরীণ প্রোটিনের ক্ষয় এবং সাথে মৃতপ্রায় ও ক্ষতিগ্রস্ত কোষের স্থলে নতুন কোষের গঠন প্রক্রিয়াকেই অটোফ্যাগি (Autophagy) বলা হয়। এক্ষেত্রে কোষের এই উপাদানের পচন ও পুনঃব্যবহারের বিষয়টি অনেকটা কোষের নিজেকে নিজে খেয়ে ফেলার মতো। আপাতদৃষ্টিতে, এটা অস্বাভাবিক মনে হলেও, এটি জীব দেহের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া এবং একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা পদ্ধতিও যার মাধ্যমে শরীর ক্ষুধা, ব্যকটেরিয়া ও ভাইরাস মোকাবেলার মতো কাজগুলো করে থাকে। অটোফ্যাগির নানা সমস্যার কারনেই ডায়াবেটিস ( Diabetes), পার্কিনসন্স (Parkinsons) জাতিয় রোগের সৃষ্টি হয় শরীরে। এমনকি এই প্রক্রিয়া  এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ যে এটা অর্কাযকর হয়ে গেলেই তা স্মৃতিভ্রংশের মতো বার্ধক্য জনিত রোগের কারন হতে পারে বলে ধারনা করা হয়। 

Autophagy
প্রতিনিয়ত মানবদেহে ক্রিয়াহীন কোষগুলো ধ্বংসের মধ্যেদিয়ে নতুন কোষের সৃষ্টি হয়। ১৯৬০ সালে এই বিষয়টি প্রথম বিজ্ঞানীদের নজরে আসে। তখন বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, কোষ কিভাবে আবর্জনা বা ক্ষতিগ্রস্ত উপাদানকে নিজের ভিতর ঝিল্লি তৈরি করে আটকে ফেলে এবং লাইসোসোম ( Lysosome) নামক রিসাইক্লিং চেম্বারে তা সরিয়ে নেয়। কিন্তু মূল রহস্য ছিল কিভাবে এই অঙ্গাণু প্রোটিন ও অন্যন্য বস্তুকে ভেঙ্গে পুনরায় শক্তি উৎপাদন করে। আর এই কাজটিই দেখান ইয়োশিনোরি ওহশুমি (Yoshinori Ohsumi)। জাপানের বিজ্ঞানী ওহসুমি প্রথমবারের মতো কিভাবে কোষের ভিতর এই প্রক্রিয়া চলে তা আবিষ্কার করেন।  নব্বইয়ের দশকে বেকারিতে তিনি ঈস্ট নিয়ে গবেষনা করে সেই জিনটি শনাক্ত করেন যা অটোফ্যাগির পিছনে মূল ভূমিকা পালন করে। যদিও তিনি ঈস্ট কোষে অটোফ্যাগি জীন আবিষ্কার করেন, কিন্তু উন্নত মানবদেহেও এটা একই পদ্ধতিতে কাজ করে।  শুধু মানুষ না, উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গেও এই প্রক্রিয়া কাজ করে। এই আবিষ্কার ২০১৬ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে তাকে নোবেল পুরষ্কার এনে দেয়। তিনি বর্তমানে টোকিও ইন্সটিউট অভ টেকনোলোজিতে প্রফেসর হিসেবে কর্মরত আছে। 

অটোফ্যাগি প্রক্রিয়া বেশি হয় জীবের প্রতিকূল অবস্থায়। যেমন দীর্ঘ সময় খাদ্য বিরতি থাকলে। এমন সময় কোষ পুষ্টির অভাবে তার অভ্যন্তরীন বর্জ্য পদার্থ বা রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম এমন সব ব্যকটেরিয়া ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে। আবার ক্ষতিগ্রস্ত ও মৃতপ্রায় কোষগুলোকে মেরে ফেলে নতুন কোষের গঠন সম্পন্ন করে। এভাবে কোষগুলো নবজীবন লাভ করে। এই প্রক্রিয়া সেই সব কোষেই শুরু হয় যেখানে সেলুলার স্ট্রেস শুরু হয়। সেলুলার স্ট্রেস বলতে এমন এক অবস্থাকে বুঝায় যখন পুষ্টির অভাবে কোষের বৃদ্ধি থেমে যায় এবং প্রাণশক্তি ফুরিয়ে যেতে শুরু করে। একদিকে কোষের ধ্বংস হয় অন্যদিকে নতুন কোষের গঠন শুরু হয়। এক্ষেত্রে অটোফ্যাগি এইদুটির মধ্যেই ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। 

পাশাপাশি এই প্রক্রিয়া জীবে দেহকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি অল্পবয়সে বুড়িয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। আর সবচেয়ে বেশি অটোফ্যাগি হয় উপোস থাকা অবস্থায়। মানে আপনি যখন টানা দীর্ঘ সময় (সাধারণত দিনের একটা বড় অংশ) খাবার গ্রহন থেকে বিরত থাকেন। বিজ্ঞানীমহল আশা করছেন,  অটোফ্যাগির সমস্যার কারনে যেহেতু ডায়াবেটিস , পারকিনসন্স এমনকি ক্যান্সার (Cancer) পর্যন্ত হয়; তাই এই আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়ে ডায়াবেটিকস, জিনবাহী রোগসহ বহু দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা আবিষ্কার করা সম্ভবপর হতে পারে।